হলুদে স্নায়ুবিষ!

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
লিখেছেন আশরাফ মাহমুদ (তারিখ: বিষ্যুদ, ২৬/০৯/২০১৯ - ৬:৪৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:


আপনি যদি বাঙালি খাবার কিংবা উপমহাদেশের খাবার খেয়ে থাকেন তবে ধরে নিতে পারি যে আপনি হলুদ-সমৃদ্ধ (Turmeric) খাবার খান। তবে এই ক্ষেত্রে আপনার জন্য একটি ভয়াবহ দুঃসংবাদ আছে, বিশেষত আপনি যদি বাঙলাদেশে বাস করে থাকেন ও খাবারে হলুদ ব্যবহার করে থাকেন!


স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকদের নতুন গবেষণা মতে বাঙলাদেশে উৎপাদিত হলুদে ব্যবসায়ীরা (কিংবা উৎপাদনকারীরা) সীসা (lead) মেশাচ্ছেন, হলুদকে আর-ও হলদে রঙা করে দৃষ্টিনন্দিত করার জন্য ও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য। তারা তাদের গবেষণায় পেয়েছেন যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই মিশ্রিত সীসার পরিমাণ প্রাকৃতিকভাবে যে মিশ্রণ হতে পারে (যদি হলুদ উৎপাদিত হচ্ছে এমন জায়গায় সীসার আধিক্য থেকে থাকে) তার চেয়ে ৫০০ গুণ বেশি! ৫০০ গুণ বেশি!


ঘটনার রহস্য উন্মোচন শুরু হয় ২০১৪ সাল থেকে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বাঙলাদেশের গ্রামীন জনগোষ্ঠীতে সীসার পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য যায়। তারা প্রাপ্ত ফলাফলে দেখেন যে গর্ভবতী মায়েদের প্রায় ৩০% এর ক্ষেত্রে রক্তে সীসার পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় বিপদজনকভাবে বেশি। এর কারণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে গবেষকরা মাটির উপাত্ত সংগ্রহ করেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন উৎস থেকে সীসা মিশ্রণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেন। কিন্তু এতো বিপদনজক মাত্রার সীসার উপস্থিতি ব্যাখ্যা করা যায় না প্রাকৃতিকভাবে ঘটার সম্ভাবনা থেকে কিংবা কারখানা থেকে আসা বর্জ্যের মিশ্রণের সম্ভাবনা-ও (যেহেতু গ্রামীন এলাকা তাই সেইরকম সীসা-উৎপাদন করে এমন কারখানা নেই)। তারা বিভিন্ন অঞ্চলের চাষীদের সাথে কথা বলেন, মশলা প্রস্তুতকারীদের সাথে আলাপ করেন। ক্রমে তারা খতিয়ে দেখেন যে অনেক ক্ষেত্রে হলুদের রঙ বেশি বেশি হলদে করার জন্য মশলা প্রস্তুতকারীরা সহজলভ্য ও সস্তা উপায় হিসেবে কারখানাজাত সীসার রঞ্জক পদার্থ বা চূর্ণ মেশান।

এই ব্যাপারে সবচেয়ে বড় প্রমাণ আসে যখন গবেষকরা জনগোষ্ঠীর রক্তে সীসার আইসোটোপ ও বাজারে বিক্রি হওয়া হলুদে সীসার আইসোটোপে মিল খুঁজে পান, অর্থাৎ, এই হলুদ খাওয়ার ফলেই রক্তে সীসার পরিমাণের আধিক্য, এবং এই ব্যাপারে অসাধু ব্যবসায়ী ও হলুদ প্রস্তুতকারীরাই দায়ী। ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে যে এইসব কারখানায় যেসব কর্মীরা হলুদে সীসার রঞ্জক পদার্থ বা চূর্ণ মেশাচ্ছেন তারা সীসার স্নায়ুবিষপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত নন, লাভের জন্য এইসব করছেন, গবেষকরা কথা বলে তাই জেনেছেন।


পরিবেশ থেকে বিভিন্নভাবে শরীরে নানা ধাতু ও রাসায়নিক পদার্থসমূহ প্রবেশ করতে পারে, তাই বিভিন্ন ধাতুর একটি সহ্য-সীমা (limit) দেওয়া থাকে, কিন্তু সীসার ক্ষেত্রে শূন্য থাকায় শ্রেয়, এইকারণে পৃথিবীর যাবতীয় উন্নত দেশে খাদ্যে ও খাবারের পানিতে সীসা মিশ্রণ নিষিদ্ধ এবং সীসার মাত্রা নির্ণয়দের জন্য নিয়মিত পরীক্ষার তাগিদ দেয়া হয়। তারপরে-ও খাদ্যচক্র ও পানিচক্রে কিছু কিছু সীসা চলে আসতে পারে, যদি খাদ্য ও পানীয় (ও ব্যবহৃত) জলের উৎস কোনো দূষণের কাছাকাছি হয়, যেমন, পুরাতন গাড়ি, জাহাজ ইত্যাদি সরাই ও মেরামতের জায়গা, বিভিন্ন কারখানা, মাইন, ইত্যাদির ধারেকাছে হয়। উন্নত দেশে এইসব কারখানা এমনিতেই খাবার কিংবা পানীয় প্রক্রিয়াজাতের কারখানার ধারেকাছে স্থাপন করতে দেওয়া হয় না। তবে গবেষকরা ভাবলেন যে যেহেতু বাঙলাদেশে এইসব ক্ষেত্রে ভালো আইন নেই, কিংবা প্রয়োগ শিথিল, তারা ভাবলেন যে কোনো দূষণের উৎস থেকে সীসা এসে মিশছে। কিন্তু গবেষকরা দেখলেন যে বাঙলাদেশে অনেক জায়গায় যেখানে প্রধানত হলুদ চাষ করা হয় সেখানকার কারখানা থেকে আগত সীসার পরিমাণ হলুদে স্বাভাবিক মাত্রার ৫০০ গুণ বেশি সীসা পাওয়ার ব্যাপার ব্যাখ্যা করতে পারে না। গবেষকরা তখন অন্য চিন্তা মাথায় নিলেন, তবে কি কৃত্রিমভাবে হলুদের মান ব্যতিক্রম করা হচ্ছে, পরে সীসা মেশানো হচ্ছে?

এর আগে গত বছর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে যে বিভিন্ন মশলায় অতিরিক্ত সীসার কারণে আমেরিকান শিশুদের রক্তে সীসার পরিমাণ বেশি, যা আমদানিকৃত মশলা থেকে এসেছে। এরপরে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ এর বেশি সংখ্যক হলুদ আমদানিকারী প্রতিষ্ঠান তাদের হলুদ রি-কল করেছে, অতিরিক্ত সীসার পরিমাণ পাওয়াতে। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ৯০% মশলা আমদানিকৃত, ফলে আমদানিকৃত মশলায় সীসার পরিমাণ বেশি হওয়ায় খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (Food and Drug Administration) কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমদানি নিষিদ্ধ করা, এবং নিরাপদ মান হালনাগাদ করার চিন্তা করে।


সীসা মস্তিষ্কের জন্য খুবই খারাপ, এটি একটি স্নায়ুবিষ (neurotoxin)। শরীরে প্রবেশ করলে এটি বিভিন্ন হৃদরোগ সৃষ্টি করে ও বিভিন্ন শারীরিক বিপাকীয় কাজে বাধা সৃষ্টি করে। তবে মস্তিষ্ক সীসার কারণে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কী রকম? মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংযোগ চালু রাখার জন্য বিভিন্ন এনজাইম কাজ করে থাকে, সীসা এইসব এনজাইমের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে স্নায়ুযোগাযোগ ব্যহত করে, ফলে স্নায়ুকোষসমূহের যোগাযোগ নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। সীসার আধিক্যের সাথে কগনিটিভ বা চিন্তাগত বিকাশ ব্যাহত হওয়ার কারণ-এবং-প্রভাব (cause-and-effect) সম্পর্ক পাওয়া গেছে গত কয়েক দশকের গবেষণায়। গর্ভকালীন সময়ে সীসার প্রভাবে বা সংস্পর্শে এলে মিসকারেজ, কম ওজনের শিশুর জন্ম (যেটার অনেক বাজে প্রভাব থাকে), গর্ভধারণের নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম হওয়া (premature birth) থেকে শুরু করে বিকলাঙ্গ শিশু ও মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠনের (এবং বিভিন্ন স্নায়ু্রোগে আক্রান্ত) শিশুর জন্ম হতে পারে। গবেষণা মতে, সীসার কারণে শিশুদের ও প্রাপ্তবয়ষ্কদের “আইকিউ (IQ)” ১৮ পয়েন্ট পর্যন্ত কম হতে পারে (যদি সীসার সংস্পর্শে না এসে থাকে সেই তুলনায়)। ১৮ পয়েন্ট আইকিউ কমে যাওয়া মানে বুদ্ধিমত্তায় এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়া। আইকিউ নির্ণয় করা হয় বিভিন্ন মনোবৈজ্ঞানিক ও স্নায়ুবিক পরীক্ষার মাধ্যমে, তবে এইসব পরীক্ষাসমূহের ফলাফল ব্যক্তি বা শিশুর মূল বুদ্ধিমত্তার (কল্পিত) সাথে সম্পর্কিত এবং আইকিউ নির্ধারণকারী পরীক্ষাসমূহের ফলাফল ব্যক্তি বা শিশুর মানসিক বিকাশ, ব্যবহারিক ও অ্যাকাডেমিক সাফল্য প্রিডিক্ট করে। আইকিউর গড় সাধারণত ১০০ (দেশ ভেদে ভিন্ন হতে পারে, যেমন কানাডার লোকজনের গড় আইকিউ ১০৬, আমেরিকানদের আবার ১০০, চৈনিকদের ১০৮ ইত্যাদি), এবং এটির স্ট্যান্ডার্ড ডিভিয়েশন ১৫; তারমানে ১৮ পয়েন্ট আইকিউ কমে যাওয়া মানে গড় বুদ্ধিমত্তার পরের ধাপে শিশু বা ব্যক্তির বিকাশ গিয়ে ঠেকবে, ব্যাপারটি অনেকটা এইরকম হতে পারে: গণিতে ৮০-৯০ পাওয়ার জায়গায় ৪০-৫০ পাওয়া, যদি আমি সাধারণভাবে (lay-man term) বলি।


লেখার শুরুতে আমি বলেছি যে যদি আপনি বাঙলাদেশে বাস করে থাকেন তবে আপনার জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ আছে। কারণটা হচ্ছে যে গবেষকরা বাঙলাদেশে হলুদ উৎপাদনকারী নয়টি অঞ্চলের সাতটিতে এই সীসা মেশানোর প্রমাণ পেয়েছেন। এবং প্রধানত বাঙলাদেশের লোকজনের কাছেই এই সীসা-মেশানো হলুদ বাজারজাত করা হচ্ছে! চিন্তা করে দেখতে পারেন এই সীসা-মেশানো হলুদ সেবনের ফলে কতো শিশু ও বয়ষ্কদের মানসিক ও স্নায়ুবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, বিভিন্ন স্নায়ুবিক রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। গবেষকরা অবশ্য সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে এই সীসা-মেশানো হলুদ সরাসরিভাবে রপ্তানী না হলে-ও পৃথিবীর অন্যত্র এই সীসা-মেশানো হলুদ বাঙলাদেশ থেকে রপ্তানী হয়ে থাকতে পারে।


ইতিমধ্যে গবেষকদের এই দুই গবেষণাপত্র (Environmental Research এবং Environmental Science & Technology বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বার্তাসংস্থায় এসেছে। এবং ধারণা করছি উত্তর আমেরিকার সরকারসমূহ আমদানীকৃত মশলা, বিশেষ করে হলুদের ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি রাখবে। কিন্তু কথা হচ্ছে বাঙলাদেশ সরকার, বাঙলাদেশের জনগণ কী করবে? আপনি কী করবেন?

আমার জানা নেই বাঙলাদেশে খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন এই ব্যাপারে জানে কিনা, এবং জেনে থাকলে তাদের পদক্ষেপ কী কী, তবে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে যতো দেরি হবে ততো দেশের জনগোষ্ঠীরই ক্ষতি। সরকারের উপর হাল ছেড়ে না দিয়ে নিজে থেকে কিছু করুন, নিজে জানুন, অন্যকে জানান, তাহলে অন্তত লোকজন সচেতন হবে।


এই ব্যাপারে গবেষকদের এই ভিডিওটি দেখতে পারেন:


মন্তব্য

সন্দেশ এর ছবি

সচলায়তনে অন্যত্র পূর্বপ্রকাশিত লেখা প্রকাশ করা নিরুৎসাহিত করা হয়। জনগুরুত্ব বিবেচনা করে এ লেখাটির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম অনুসরণ করা হচ্ছে। ধন্যবাদ।

আশরাফ মাহমুদ এর ছবি
Aaynamoti এর ছবি

কী ভয়াবহ ব্যাপার! ইতিমধ্যে না জানি কতটা ক্ষতি হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নাকে তেল দিয়ে না ঘুমিয়ে এই বিষয়ে নজর দিলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।
খুব জরুরী লেখা। লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ।

এক লহমা এর ছবি

রোজ সকালবেলা মূলতঃ ভারত উপমহাদেশের থেকে আসা জিনিষে ভরা দোকান থেকে আনা হলুদ খাই। কে জানে, কি খাচ্ছি!

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।