মহাসমুদ্রের বাঁকে বাঁকে- এঙ্গেল সি (তৃতীয় পর্ব)

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: শনি, ২৭/০৭/২০১৯ - ১০:৪২পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

চলুন টরকি থেকে বেরিয়ে পরা যাক। টরকি থেকে বেরিয়ে গ্রেট ওশান রোড ধরে ১৮ কি.মি. গেলেই এঙ্গেল সি। সমুদ্র তীরবরতি লাল পাহাড়, হাইকিং ট্রেইল আর গল্ফ ক্লাবের জন্য এঙ্গেল সি বিখ্যাত। এঙ্গেল সি তে উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলো হল এঙ্গেল সি গল্ফ ক্লাব, এঙ্গেল সি বীচ পয়েন্ট, এডিস,পয়েন্ট, রোডনাইট, আইস্ক্রিম আর চকোলেট ফ্যাক্টরি, এঙ্গেল সি আর্ট ওয়াক ইত্যাদি। পরিশ্রমী পর্যটকদের জন্য বীচ আর বনের ভিতর দিয়ে ১০০ কি. মি. লম্বা দৌড়ানোর রাস্তা। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য আছে এঙ্গেল সি সারফিং ক্লাবে সারফিং এর হাতে খড়ি নেয়ার সুযোগ। মহা সমুদ্রের বাকে বাকে ঘুরছি বলে কি নদী নেই! ইচ্ছে হলেই এঙ্গেল সি নদীতে ক্যানো বা প্যাডেল বোট ভাড়া করে নেমে যেতে পারেন।করতে পারেন মাউন্টেইন বাইকিং, আর কত অ্যাডভেঞ্চার চাই?

টরকিতে নিশ্চয়ই স্থানীয় মানুষদের সাথে একটু আধটু কথাবার্তা হয়েছে? কিন্তু যারা সত্যিকার স্থানীয়, মহাসমুদ্রের বাঁকে বাঁকে - ভূমিকা পর্বে উল্লেখ করা গুডাবানুড আদিবাসীদের মত যারা হারিয়ে যায়নি,তাদের সাথে দেখা করবেন না ! আমি ক্যাংগারুর কথাই বলছি! ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে যেকোন জংগলে কিংবা রাস্তার ধারে আপনি ইতোমধ্যে ক্যাংগারু দেখে ফেলেছেন। ভাগ্য খারাপ হলে ক্যাংগারুর সাথে ধাক্কা লেগে আপনার গাড়ির দফারফা হয়ে গেছে। হাইওয়েতে এরকম দুর্ঘটনা অস্ট্রেলিয়াতে হর হামেশাই হচ্ছে। (যেখানে ক্যাংগারু রাস্তায় উঠে পড়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানে আগে থেকেই ক্যাংগারুর সাইনবোর্ড টানানো থাকে।) উপরের কোনটাই যদি না ঘটে থাকে, তাহলে চলে যান এঙ্গেল সি গল্ফ ক্লাবে। নিশ্চিত ক্যাংগারু দেখতে পাবেন, এমনিতেও অস্ট্রেলিয়া এসে ক্যাংগারু না দেখে দেশে ফিরলে আপনার মান সম্মান থাকবেনা। দেরি না করে ঢুকে পরাই উত্তম, প্রবেশ মূল্য বড়রা $১০, শিশুরা $৫।

এঙ্গেল সি গল্ফ ক্লাব অসম্ভব সুন্দর আর চোখ জুড়ানো সবুজে আচ্ছাদিত।এই ক্লাবে গল্ফ খেলার যে সুযোগ সুবিধা রয়েছে তা পুরো পৃথিবী জুড়েই বেশ বিখ্যাত। যাই হোক, এখানে যেই ক্যাংগারু গুলো দেখতে পাওয়া যায় সেগুলো ইস্টার্ন গ্রে ক্যাংগারু, ম্যাক্রোপাস জাইজেন্টিয়াস (বৈজ্ঞানিক নাম)। এই বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ হল বড় পা বিশিষ্ট। অনেক ক্যাংগারুর গায়ে দেখবেন ট্যাগ লাগানো আছে, তাতে লেখা আছে তার নাম। কারন প্রানীবিজ্ঞানিরা এই গল্ফ ক্লাবের ক্যাংগারু নিয়ে গবেষণা করেন। নাম লিখে রাখলে হিসাব/ গবেষণাইয় সুবিধা হয়। ক্যাংগারু তৃণভোজী আর নিরীহগোছের প্রানী। ওদেরকে না ঘাটালে ওরা আপনাকে আক্রমণ ও করবেনা এবং ভয়ও পাবেনা। আপনি একদম কাছে থেকে গিয়ে ওদের সাথে ছবি তুলতে পারবেন।

চিত্র ১ঃ গলফ ক্লাবে ক্যাঙ্গারু

চিত্র ২ঃ গলফ ক্লাবে ক্যাঙ্গারু

চিত্র ৩ঃ রাস্তায় হরহামেশাই দেখা যায় ক্যাঙ্গারু সংকেত

এঙ্গেল সি তে আছে বেশ কিছু আইস্ক্রিম আর চকোলেট ফ্যাক্টরি। এগুলো দেখতে কোন প্রবেশমূল্য নেই।মাত্র ৩ ডলারের বিনিময়ে ১২ রকম টাটকা চকোলেট চেখে দেখতে পারবেন। সেখান থেকে কোনটা পছন্দ হলে কিনে নিতে পারবেন কেজি দরে। এসব ফ্যাক্টরিতে প্রতিদিনই শিশুদের জন্য না না আয়োজন, খেলাধুলা, ফ্যাক্টরি ট্যুর এসব লেগেই থাকে !

চিত্র ৪ঃ চকোলেট কারখানার ভবন

চিত্র ৫ঃ সারি সারি সাজানো চকোলেট

গ্রীষ্মেকালে এঙ্গেল সি এর পয়েন্ট এডিস মেরিন ন্যাশনাল পার্ক থেকে স্নোরকেলিং আর স্কুবা ডাইভিং এর ব্যবস্থা রয়েছে। টাকা আর সময়ের সীমাবদ্ধতা না থাকলে সাগরের তলদেশ টাও এই ফাঁকে দেখে নেয়া উচিত। স্নোরকেলিং য়ের অভিজ্ঞতা যে কত অসাধারণ হতে পারে,তা আমার আরেকটা লেখায় ( স্বপ্নদ্বীপ পারহান্তিয়ান) বর্ণনা করেছি।

চিত্র ৬ঃ এডিস মেরিন ন্যাশনাল পার্ক

চিত্র ৭ঃ এডিস মেরিন ন্যাশনাল পার্কের সৈকতে স্টারফিস

প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে কাছে পেতে এঙ্গেল সি বেশ উপযুক্ত শহর। এখানে পর্যটকদের ভীড় কম। কারণ যারা কম সময় নিয়ে আসে (২-৩ দিন),তারা গ্রেট ওশান রোডের মূল আকর্ষণগুলো দেখতে ব্যাস্ত থাকে। এঙ্গেল সি গ্রেট ওশান রোডের মূল আকর্ষণের মাঝে পড়েনা। আমার ধারনা ২-৩ দিন সময় শুধু এঙ্গেল সি তে ব্যয় করলেই এঙ্গেল সি কে আয়েশ করে অনুভব করা যাবে। অবশ্য পুরো গ্রেট ওশান রোড জুড়েই এত কিছু আছে যে এই কথাটা গ্রেট ওশান রোডের ১০ টা শহরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য!

গ্রেট ওশান রোড যেতে হলেঃ মেলবোর্ন এয়ারপোর্ট থেকে সাড়ে তিন থেকে ৪ ঘন্টা গেলেই গ্রেট ওশান রোড শুরু। মেলবোর্ন শহর থেকে তিন ঘন্টা ড্রাইভ। সম্ভবত ৯০ ভাগ মানুষ গ্রেট ওশান রোডে নিজের গাড়ি ড্রাইভ করে যায়।। আপনি পর্যটক হলে গাড়ি ভাড়া করে চালিয়ে যেতে পারেন। আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং লাইসেন্স এ গাড়ি চালানো অস্ট্রেলিয়া অনুমোদন দেয়। গাড়ির মডেল আর আকৃতিভেদে ভাড়া ভিন্ন হবে। ট্যুরিস্ট বাসে এক/দুই দিনের প্যাকেজে যেতে পারেন (জনপ্রতি ৫০-২০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার),কিন্তু মন ভরে দেখার সময় না ও মিলতে পারে। নিজে ড্রাইভ করাই আনন্দদায়ক ও সাশ্রয়ী।

কোথায় থাকবেনঃ গ্রেট ওশান রোডের সর্বত্রই ছোট বড় হোটেল, মোটেল আছে। সময়ভেদে দাম উঠানামা করে। ক্রিস্মাসের সময় আগে থেকে বুকিং না দিলে গাড়িতেই থাকতে/শুতে হবে! অনলাইনে যে কোন সময় বুকিং দেয়া সম্ভব। দুজন মানুষের জন্য ১০০-১৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলারে থাকার জায়গা পাওয়া উচিত। এয়ার বি এন বি অস্ট্রেলিয়াতে খুব জনপ্রিয়। একটু হাত পা ছড়িয়ে লোকাল লোকজনের পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকতে এর বিকল্প নেই। দাম হয়ত একই পড়বে কিন্তু আরাম করে থাকতে পারবেন। সাথে স্থানীয় মানুষের সাথে মেশার সুযোগটা বাড়তি পাওনা।

কি খাবেনঃ গ্রেট ওশান রোডে প্রচুর ফিশ এন্ড চিপস এর রেস্তোরাঁ আছে। ঐতিহ্যবাহী তাজা সামুদ্রিক মাছ ভাজি খেতে চাইলে এত বিকল্প নেই। বাজেট কম থাকলে শুকনো খাবার আর স্যান্ডউইচ নিয়ে নিন। আর কম খরচে খাবার জন্যে ম্যাকডোনাল্ড আর কে এফ সি তো আছেই। হালকা খাবার খান, বেশি ঘুরতে পারবেন।কথা দিচ্ছি প্রকৃতি দেখে পেট ভরে যাবে!


মন্তব্য

অতিথি লেখক এর ছবি

এই লেখাটাতে আগের পর্বগুলোর মতো 'পারসোনাল টাচ' নেই। অনেকটা দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টের মতো হয়ে গেছে। এখানে পাঠকেরা লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ আর মতামত জানতে আগ্রহী থাকেন। দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টের সাথে অনলাইন রাইটার্স ফোরামের পার্থক্য এখানে। এই পর্বেও ছবির ক্রেডিট উল্লেখ করা হয়নি। কোথায় থাকবেন, কী ('কি' নয়) খাবেন জাতীয় ফিনিশিং দেখে তো মনে হচ্ছে সিরিজ শেষ। আসলেই কি তাই?

- আরিফ

অতিথি লেখক এর ছবি

পারসোনাল টাচ আর ক্রেডিটের কথাটা মাথায় থাকবে। পর্ব শেষ হয়নি। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

অবনীল এর ছবি

ছবিগুলো অসাধারন । বিশেষ করে গলফ মাঠে ক্যাঙ্গারুর ছবিটা অতুলনীয়। যাবার আগ্রহ থাকলো। হয়ত একদিন...

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

সৌখিন  এর ছবি

ধন্যবাদ

হিমু এর ছবি

আপনার ফোনে বা ক্যামেরায় যদি HDR এর সুযোগ থাকে, কিছু ছবি সেভাবে তুলে দেখবেন নাকি?

এক লহমা এর ছবি

পড়তে ভালো লেগেছে। জানা গেছে দ্রষ্টব্য নিয়ে দরকারি তথ্য। প্রথম মন্তব্যে আরিফ যা লিখেছেন সেটা থাকলে আরো ভাল লাগবে।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।