আলঝেইমারে ফিরে এলো পরকীয়া।

অতিথি লেখক এর ছবি
লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বিষ্যুদ, ২২/০৪/২০২১ - ৭:১১পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

আলঝেইমারে ফিরে এলো পরকীয়া।

করবী মালাকার

সমুদ্রে প্রায় ডুবে যাওয়া সূর্যটির ছড়ানো গোধূলী আলোর সঙ্গে মিলিন্ডা হারমানের কন্ঠের গানে প্রবীণ নিবাসটি ভরে উঠেছে। তিনি গাইছেন -

"If I was hungry you would feed me
If I was in darkness you would lead me to the light
If I was a book I know you'd read me every night ".

কানাডার টরন্টো শহরের একটি প্রবীণ নিবাস। এখানে কোন কোন প্রবীনের বয়স একশ ছাড়িয়ে গেছে। উন্নত বিশ্ব, নারী পুরুষ সহ অবস্থানের কোন বাধা নেই। সকলের আলাদা, আলাদা থাকার রুম। প্রয়োজনে কেউ কেউ রুমেই খাওয়া দাওয়া করে। বেশীর ভাগ সময় সবাই মিলে আনন্দ করে ডাইনিং এ খায়। এখানে প্রবীনরা শিশুদের মত খেলাধুলা করে। মূলত উন্নত বিশ্বে এই নিবাসকে প্রবীণদের নতুন বাসস্থান মনে করা হয়। তাদেরকে রেসিডেন্ট বলা হয়। পেশেন্ট, বোর্ডার বা গেস্ট বলা হয় না।

টরন্টোর সুগার বিচের কোয়াটার মাইল দূরে এই প্রবীণ নিবাস। নিবাস থেকে সমুদ্রের মাঝে কোন স্থাপনা নেই। সেভাবেই পরিকল্পনা করা হয়েছে। গৃহ থেকেই সমুদ্র দেখা যায়। দেখা যায় সমুদ্রের ঢেউ, শোনা যায় সমুদ্রের গর্জন। রেসিডেন্টরা ফুলের বাগানে ঘুরে বেড়ায়, মাঠে ঘোরাঘুরি করে, গেইট পর্যন্ত এসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ নিজেই সক্ষম। কাউকে কাউকে এটেনডেনটরা সাহায্য করে। কোন কোন নারী পুরুষ হাত ধরাধরি করে হাঁটে। খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে থাকে। তাদেরকে চুম্বনরত অবস্থায়ও দেখা যায়। কেউ সচেতন ভাবেই করে। কারো হয়ত বোধ শক্তি বিলুপ্ত হয়েছে। তবে উভয় পক্ষরই কোন বিধি নিষেধ নেই। এটা তাদের অধিকার হিসেবেই দেখা হয়। ওসব দেশে যুবক যুবতীদের যেমন বিধি নিষেধ নেই । তেমনি প্রবীণদেরও নেই।

মিলিন্ডা হারমানের বয়স ৬৩। টমাস ডেরেঞ্জারের বয়স ৭২। মিলিন্ডার একটি পুত্র আছে। সে তাকে এখানে ভর্তি করে দিয়ে গেছে। তবে সে খুব বেশী মাকে ভিজিট করতে আসে না। টমাস নি:সন্তান । তার স্ত্রী প্রতি মাসে তাকে ভিজিট করতে আসেন । কিন্তু টমাস তাকে চিনতে পারেন না। কেননা তার আলঝেইমার হয়েছে। মিলিন্ডারও আলঝেইমার। এই রোগ ছাড়া তারা দুজনেই বেশ ভাল স্বাস্থ্যের। মোটামুটি সুস্থ। এই দুজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কেবল বন্ধুত্ব নয়। প্রেমের সম্পর্ক। দুজনে সব সময় এক সাথে থাকে। খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটায়। মিলি ও টম নামে পরস্পর পরস্পরকে ডাকে। বেশীর ভাগ সময় তারা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে গল্প করে। দূর থেকে মিলিন্ডার কন্ঠের গান ভেসে ভেসে বেড়ায় এই নিবাসের সমস্ত আঙিনা জুড়ে। মিলিন্ডা ও টমাস খুব সচেতন ভাবেই প্রেমে মাতেন। দেশের আইন অনুযায়ী তাদের এই প্রেমে কেউ বাধা দিতে পারে না। তাই সুখী প্রেমিক যুগল হিসেবে তাদের নতুন বাসস্থানে তাদের দিন অতিবাহিত করছেন।

কিন্তু আসল রহস্য জানা গেল টমাসের স্ত্রীর কাছ থেকে। তিনি প্রতিমাসে এখানে আসেন। তাই তিনিও টমাস মিলিন্ডার এই প্রেম আবিষ্কার করেছেন। তখন তিনিই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্যটা তুলে ধরেছেন এই নিবাসের ব্যবস্থাপকদের কাছে।

টমাস, মিলিন্ডা পূর্ব পরিচিত। মিলিন্ডা ছিল টমাসের তত্বাবধানে ইন্টার্ন। মিলিন্ডার প্রতি টমাসের উচাটন তার স্ত্রী লক্ষ্য করেছিলেন। তবে তিনি তার এই সন্দেহবাতিক মনকে নিজেই ধিক্কার জানিয়েছিলেন। তখন তারা ছিলেন মনট্রিলে। এরপরে টমাস তার স্ত্রীকে নিয়ে টরেন্টোতে আসলেন। তিনি নিশ্চিত এরপরে টমাসের সাথে মিলিন্ডার কোন যোগাযোগ হয়নি। সে সময়ে ডিজিটাল যোগাযোগ এত এডভ্যান্স ছিল না। এর পর কতটা সময় কেটে গেছে।

আলঝেইমার রোগ মানুষকে তার অতীত স্মৃতিকে ভুলিয়ে দেয় । তবে কারো কারো ক্ষেত্রে নিকট অতীতকে ভুলিয়ে দিয়ে ফিরিয়ে দেয় দূর স্মৃতিকে। হয়ত টমাসের স্ত্রীর সন্দেহটা ভুল ছিল না। টমাস মিলিন্ডার উভয়ই নিকট অতীতকে ভুলে গিয়ে তাদের সেই হালকা আকর্ষণের সময়টিতে ফিরে গিয়ে এখন তাদের প্রেমকে গাঢ় করছেন।

পাঠক , এটা কি তাদের পরাবাস্তব?! নাকি এখন এই প্রেমই টম-মিলির জীবনের সত্য?!


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

রোগটার নাম বাংলায় লিপ্যন্তর হওয়া উচিত আল্ৎসহাইমার (আল্ৎসহাইমারের ব্যাধি আসলে)। আলঝেইমার একেবারেই নয়।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।