আইসিস এর মন্দিরে

ওডিন এর ছবি
লিখেছেন ওডিন (তারিখ: রবি, ১৮/০৭/২০২১ - ১০:৩৩অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

অনেক অনেক যুগ পরে একটা ব্লগ লিখতে গিয়ে দেখি A,S ,D, W, Q, E, R, স্পেসবার, লেফট শিফট ইত্যাদি , মানে গেম খেলতে যেইসব কি লাগে, সেগুলো বাদে বাকি কিবোর্ড বিকল হয়ে বসে আছে। তাই বলে কি ব্লগরব্লগর বন্ধ থাকবে? কখনোই না। তাই এসে গেলো গুগল ভয়েস টাইপিং এ লেখা এই টাটকা তাজা ভ্রমন্থণ!
_________________

আইসিস নাম শুনলে সংগত কারণেই অনেকে নড়েচড়ে বসবেন। মগনলাল মেঘরাজের ভাষা ধার করে বলা যায়- "নাম বোলছেন কেনো? বোদনাম বোলুন।" টয়োটা তাদের খুব নামকরা একটা মিনিভ্যান পর্যন্ত ডিসকন্টিনিউ করে দিয়েছে সেইটার আইসিস নাম ছিল দেখে।

যাই হোক- আইসিস ছিলেন একজন প্রভাবশালী মিশরীয় দেবী, যিনি ইজিপশিয়ান মিথলজির মাতৃশক্তি টাইপের আরকি, দ্য মাদার গডেস। ওনার স্বামী হচ্ছেন ওসিরিস আর ছেলে হচ্ছেন দেবতা হোরাস। আইসিস এবং ওসিরিসের গল্প ইজিপশিয়ান মিথলজির একটা মূলধারা। নানা রকম উপকথা ও তৈরি হয়েছে এই মিথলজি থেকে। ষোড়শ শতকে শেক্সপিয়ার আইসিস এবং ওসিরিসের পৌরাণিক কাহিনী থেকে কিছু ট্রাজেডির উপাদানও পেয়েছিলেন। ইজিপশিয় সভ্যতার সংস্পর্শে আসার পরে গ্রীক এবং পরবর্তীতে রোমানরাও আইসিস এর উপাসনা করতো।

আমাদের মিশর ভ্রমণ এর দ্বিতীয় পর্যায়ে কায়রো থেকে সারারাত ট্রেনে চড়ে মিশরের একেবারে দক্ষিনে আসোয়ান শহরে এসেছি মূলত আবু সিম্বেলের বিখ্যাত রামেসিস টেম্পল দেখার জন্য। আসোয়ান শহর থেকে সামান্য দূরেই এই Philae, আইসিস এর মন্দির। গ্রিক, রোমান এবং মিশরীয় স্থাপত্য কলার মিশেলে এই মন্দিরটা তৈরি করা হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, মিশরজয়ী আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরে দ্বিতীয় টলেমির আমলে। এরপরে রোমানরা এসে এর নির্মাণ কাজ শেষ করে। যেই কারনে গ্রিসের পার্থেনন বা অন্যান্য মন্দিরের মত পিলার এবং কলামের আধিক্য দেখা যায়। সেই আমলে মোটামুটি নামকরা জায়গা ছিল সেনেকা থেকে শুরু করে প্লিনি দা এল্ডার এনারাও এই মন্দিরের কথা লিখে গেছেন।

গত শতকের ষাটের দশকে নীল নদের ওপর আসোয়ান বাঁধ তৈরি করে যখন নীলনদের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা করা হয়, তখন বাঁধের জন্য সৃষ্টি হওয়া বিশাল লেকে আবু সিম্বেল এর মন্দিরসহ এটিও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা যায়। তাই ইউনিসেফ এর নেতৃত্বে মাল্টিন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারদের দল আবু সিম্বেল মন্দিরের মত এই মন্দিরটাকেও টুকরো টুকরো করে আলাদা করে, লেক নাসের এর মধ্যে একটা কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে, তার মধ্যে লেগোর মত এনে বসিয়েছে। আসোয়ান শহর থেকে ছোট মোটর লঞ্চে চেপে এই নতুন দ্বীপে আসতে হয়।

মন্দিরের কমপ্লেক্সে এই প্রথম একটা বড় চত্বর যার একপাশে মূল মন্দিরের কমপ্লেক্স আরেক পাশে একটা বিচ্ছিন্ন আলাদা স্থাপনা যেটাকে বলে হাইপোস্টাইল হল। মূল মন্দিরের প্রধান তোরণে নানান খোদাই চিত্রে শাসনকর্তা টলেমি, দেবী আইসিস, বাজপাখির মুকুট পরা আইসিস পুত্র হোরাস, এবং আরো নানা দেব দেবীর কাজকারবার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এরপরে আরেকটি খোলামেলা চত্বর, যেটা পার হয়ে দ্বিতীয় তোরণ, সেখানেও এরকম আলংকারিক কাজ।
দ্বিতীয় তোরণ পার হওয়ার পরে রয়েছে সব প্রার্থনা কক্ষ এবং পবিত্র ঘর। কয়েকটা ঘরে আবার প্রাচীন ক্রিশ্চিয়ান কিছু ফ্রেস্কো দেখা যায়।

হাইপোস্টাইল হলটা খুবই ইন্টারেস্টিং। চোদ্দটা কারুকাজ করা কলাম এর ওপর দাঁড়ানো। আমাদের গাইডের কোথায় যেটা বোঝা গেল যে এই কলামগুলো নাকি পৃথিবীর প্রথম বাগানের প্রতীকী রূপ। গাছ লতাপাতা আর ফুলের এমন মিশেল দেয়া হয়েছে যে দেখলে মনে হবে এটি ফুলের মন্দির। যদিও পরে উইকি ঘেঁটে জানতে পারলাম যে যে এই হাইপোস্টাইল হলটা রোমান এম্পেরোর ট্রাজান এর তৈরি করা। যদিও মন্দিরের অনেক কয়টা অংশের মতো এইটাও অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

আইসিস এর মন্দির দেখা শেষ করে সেইদিনের মত আমরা আমাদের জাহাজে, মানে নাইল ক্রুজ শিপে আশ্রয় নিলাম। বলা হয় নি, আমরা ঢাকা-ফিনল্যান্ড-আমেরিকা থেকে দেড় ডজন লোক কায়রো এসে জমায়েত হয়েছিলাম আরও দিনতিনেক আগে। দুইদিন কায়রো আর একদিন আলেকজান্দ্রিয়া ঘুরে রাতের ট্রেনে সুদানের বর্ডারে এই আসোয়ান-এ আসা হয়েছে। এইখান থেকে আবু সিম্বেল গিয়ে, পরে ওই জাহাজে চেপেই মিশরের প্রাচীন রাজধানীর থিবস, মানে লুক্সর পর্যন্ত যাওয়ার প্ল্যান।

সেইসব গল্প করা হবে অন্য সময়ে।

আসলেই গল্প 'করতে' হবে, কারণ কিবোর্ড নষ্ট।


এইরকম লঞ্চে করে ফিলি দ্বীপে যেতে হয়


লঞ্চঘাটে নুবিয়ান টুপি। যাওয়ার সময় তোলা ফটো। ভাবছিলাম ফেরার পথে একটা কিনে নিবো মিশরীয় অতিপ্রাকৃত সূর্য থেকে নিজের ক্রমবর্ধমান টাক রক্ষা করার জন্য, কেনা আর হয় নাই।


মন্তব্য

তারেক অণু এর ছবি

যাক, মহান আমন-রা'র দেশের স্মৃতিকথা আসা শুরু হল তবে!

এই মন্দিরে খুব বেশী ইন্টারেস্টিং লেগেছিল মার্ক অ্যান্টনীকে মিশরীয় পোশাকে দেবতার মত সাজানো দেয়ালচিত্রে দেখা।

আমি তো ভেবেছিলাম 'আনুবিসের দেশে ওডিন' নামে সিরিজ নামিয়ে ফেলব, দেখা যাক।

ওডিন এর ছবি

নামায়া ফেলেন্না! আরও ভালো হবে। আপনি আরও ডিটেইলস লিখতে পারবেন। টেক্সটবুক ব্লগ হবে। হাসি

এরপরে ধরেন ইট্টু ইট্টু করে আমাদের দুইজনের ভ্রমন তো কম হলো না। লাদাখ, নাগাল্যান্ড, ভিয়েতনাম- আপনিও লেখেন নাই, আমিও না। চলেন দুইজনে মিলে শুরু করে দিই। হাসি

তারেক অণু এর ছবি

সেই সাথে সিকিম হয়ে উত্তরবঙ্গ! আর ঢাকার ভিতরে-বাহিরে!

লেখা হয়ে যাক শুরু-

হিমু এর ছবি

"আমার জ়েদিন থেকে বোল, সেদিন থেকেই বোলগ"

ওডিন এর ছবি

ভাই পুরোটাই ফোনে করলাম, বোঝেনই ত। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জেএসসি-র আমলে এই টেকনোলজি থাকলে আর শফিক রেহমানের শরণাপন্ন হইতে হইতো না।

ভয়েস টাইপিং এ মতিকন্ঠিয় বাংলা লেখা যাচ্ছে না

মুস্তাফিজ এর ছবি

কীবোর্ড কেনেডি বো

...........................
Every Picture Tells a Story

ওডিন এর ছবি

ভাই লিংক পাঠায়া দিই? কোলাকুলি

খেকশিয়াল এর ছবি

নর্স গডের মিশরভ্রমণকথন ভাল লাগছে। এইভাবে আরো দুখানা ব্লগ নামিয়ে ফেল দিকিনি!

-----------------------------------------------
'..দ্রিমুই য্রখ্রন ত্রখ্রন স্রবট্রাত্রেই দ্রিমু!'

ওডিন এর ছবি

তোমার লেখা দিয়ে আমারটাকে আগে নীড়পাতা থিকা ঠেইলা সরাও দেঁতো হাসি

নীড় সন্ধানী এর ছবি

ছবিগুলোর সাথে ক্যাপশান জুড়ে দেয়া গেলে আরো ভালো হতো। এই কাহিনীর পরবর্তী পর্বও আসুক। আপনাদের দীর্ঘ ভ্রমণপর্ব ছিল। এত অল্পতে মন ভরছে না।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

ওডিন এর ছবি

ফোনে লিখলাম তো। একটু ফাঁকিবাজি করেছি বলতে পারেন।

আমাদের ট্রিপটা বেশ দীর্ঘই ছিলো। কিন্ত সিরিজ হিসেবে করতে গেলে এই প্যানডেমিকে অক্কা পেয়ে গেলে মার্টিনবুড়োর মত অবস্থা হতে পারে, দেখা গেলো সিরিজটা আর শেষই হচ্ছে না। তাই ছোট ছোট লেখা লিখবো বলে ঠিক করেছি। লাদাখ, ভিয়েতনাম, হিমালয়ে আরও কিছু ভ্রমণ- অনেক লেখা বাকি পড়ে আছে।

মন মাঝি এর ছবি

যাক, শেষ পর্যন্ত আপনাদের মিশর উপাখ্যান আসা শুরু হল!! ট্রাজানের তৈরি ঐ কাঠামোটাকে "ট্রাজান্স কিয়স্ক" বলে ইংরেজিতে। ওটার পিছন থেকে লেক নাসেরের ভিউটা দুর্দান্ত না? হাসি
আপনারা মনে হচ্ছে দক্ষিণ মিশরে নীলনদ দিয়ে রিভার-ক্রুজ করেছেন? অনেকে সড়ক / আকাশ / রেল পথে না গিয়ে টুরিস্ট লঞ্চে এখানকার উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য স্থানগুলিতে ঘুরেন। আমি নানা কারনে এটা স্কিপ করেছিলাম, বিশেষ করে লঞ্চ জাতীয় বাহনে বেশিক্ষণ থাকতে ভীষণ বোরিং লাগে বলে। এটা কেমন ছিল?

****************************************

ওডিন এর ছবি

খুবই দুর্দান্ত! সেই ছবিটা এইখানে দিয়ে যাবো নে।

আমরা তিন মহাদেশ থেকে দেড় ডজন বন্দুবান্দব কায়রোতে একজোট হয়েছিলাম। সেইখান থেকে বাসে আলেকজান্দ্রিয়া, এরপরে কায়রো ফিরে রাতের ট্রেনে আসওয়ান। আসওয়ান থেকে আবু সিম্বেল দেখে রিভার ক্রুজে এদফু ইত্যাদি জায়গা দেখে লুক্সরে এসে নেমেছিলাম। লুক্সর বেড়িয়ে, বেলুন-ফ্লাইটে ভ্যালি অফ দ্য কিংস দেখে, ফ্লাইটে কায়রো। তাই বলতে পারেন সড়ক, আকাশ, নৌ, রেল- সবকয়টা পথেই ভ্রমণ করা হয়েছে। হাসি লঞ্চে তিন রাত ছিলাম আমরা, সবাই মিলে নানা আড্ডায় সময়টা খারাপ কাটে নাই। দেশে আমাদের যে বাজে দৌড়ের জীবন, একটু বিরতি ছিল আরকি।

আমি তো ভেবে রেখেছিলাম এই বরষায় রকেটে করে মোড়েলগঞ্জ গিয়ে আবার সেইটায় ঢাকা ফিরে আসবো।

কল্যাণ এর ছবি

ইসস এমন কিপ্টামি করে ছবি দিলে চল্পে! মিশর বলে কথা! এর পরেরটা একটা নীল তিমির সাইজে ছাড়েন মগনলালজি।

______________
আমার নামের মধ্যে ১৩

ওডিন এর ছবি

গলাটা সেধে নেই গো আগে, দাদা! কতক্ষণ আর বকবক করা যায় মিজান, পিষে ফ্যালো

সত্যপীর এর ছবি

থিবসের গপ দেন। লুঙ্গিতে গিঁট দিয়ে বসলাম।

..................................................................
#Banshibir.

ওডিন এর ছবি

গল্প হবে কিন্ত ছবি ছাড়া। বেনিয়া মিশরীয়গন থিবস এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ছবি তুলতে দেখিলেই টিকিট দাবী করে৷ যদিও কিপ্টেমি করে কেমেরার টিকেট কেনা বেশ ভুল হইছে।

রণদীপম বসু এর ছবি

কিবোর্ড নষ্ট হলে যদি এমন গল্প বাইর হয়, তাইলে কিবোর্ড নষ্টই থাকুক ! কী বলেন ! হা হা হা !

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

ওডিন এর ছবি

কিবোর্ড কিনছি দাদা। তবে ভয়েস টাইপে মজা আছে বেশ।

রণদীপম বসু এর ছবি

ভয়েস টাইপটা এখনো টেস্ট করা হয়নি। করবো কি না ভাবছি!

-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’

অবনীল এর ছবি

মিশর ভ্রমন নিয়ে তোমার কাছে থেকে আরো লেখা আশা করছি। একটাতে থামলে হবে না। গুগল ভয়েস, সিরি, এলেক্সা যা যা লাগে সব দিয়া লেইখা/ডিক্টেশান দিয়ে ব্লগরব্লগর বানায় ফেলো তাড়াতাড়ি। এত দেরী করলে হবে ?

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।