ট্রেন

রাহিন হায়দার এর ছবি
লিখেছেন রাহিন হায়দার [অতিথি] (তারিখ: মঙ্গল, ১৩/০৪/২০২১ - ৫:২৮পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

১.

ট্রেনটা বেশ কাছে এসে পড়েছে।

রেলগেটের ঠিক পাশের একটা দোকান থেকে সবসময় সিগারেট কেনেন মনিরুল হোসেন। তার বাসা রেললাইনের অপর পাশে, রাস্তার উল্টো দিকে। অফিস থেকে ফেরার পথে সিগারেট কিনতে থেমেছিলেন। একবার ভাবলেন, পার হয়ে যাবেন। কিন্তু সেদিনের ঘটনাটা তার আবার মনে পড়ে গেল।

সেদিন ছিল ছুটির দিন। আগের রাতে সিগারেট ফুরিয়ে যাওয়ায় বেশ সকালেই বের হয়েছিলেন। ভাংতি ফেরত নেবার সময় দেখলেন ট্রেন আসার সংকেত পড়তে। যেহেতু বাড়ি ফিরতে গাড়ির রাস্তা আর ট্রেনের রাস্তা দুই'ই পার হতে হবে, প্রথমটি পার হবার কাজ সেরে নিতে চাইলেন সিগারেট ধরাতে ধরাতে। তখনই কেউ তাকে হ্যাঁচকা টান মেরে ফেলে দিলো। প্রায় সাথে সাথেই মাটি কাঁপিয়ে চলে গেল কমলাপুরগামী ট্রেনটা।

'এহনই ত মরসিলেন।'

যথার্থ। মনিরুল রেললাইনের সমান্তরালে বেশ কাছে দিয়েই হাঁটছিলেন। ট্রেন তার পথের সীমানার বাইরেও বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে চলে, কথাটি তার মনে থাকলেও তার মন ব্যস্ত ছিল দেশলাই জ্বালাতে।

'ট্রেন আহনের সুমায় এমনে কেউ হাডে?!'

মনিরুলের প্রাণরক্ষাকারী এক বৃদ্ধা ভিখারিনী। তার চেহারাটা চিনতে পারলেন তিনি। শুক্রবার দুপুরে তাকে পাড়ার মধ্যে ভিক্ষা করতে দেখা যায়।
 
দু'তিনজন কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে আছে। বুকের ধুকপুক এত স্পষ্ট শুনতে পাবার অভিজ্ঞতাটি তার জন্য বিরল। বৃদ্ধাকে তিনি কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। 'ধন্যবাদ' শব্দটি তার মনের কোণে উঁকি দিয়েও নাকচ হয়ে গেল। পরক্ষণে মানিব্যাগে হাত দিতে গিয়েও থেমে গেলেন মনিরুল। 

সেদিন আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুতপায়ে তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন। প্রতিদিনের মতোই সকালের নাস্তা ছিল রুটি আর ডিম-পোচ। সাধারণত যা খান তার অর্ধেক খেয়ে উঠে পড়লেন। স্ত্রীর চোখ তা এড়ালো না।

'এত কম খেলে যে।
''হুঁ?'
'একটা রুটিও তো পুরো খাও নি।'
'ইচ্ছে করছে না সুমী।'
'শরীর খারাপ নাকি?'
'না।'
'চা দেব?'
'না।'
'আমার জন্য বানাচ্ছি।'
'আচ্ছা দিও।'

সকালের নাস্তার খামতিটা অবশ্য তিনি দুপুরে পুষিয়ে দিলেন নিজের অজান্তেই খানিকটা বেশি খেয়ে। একটার জায়গায় দু'টুকরো রুই মাছ। রাতে পাড়ার দোকানের গ্রিল্ড চিকেন আর পরোটা। পরদিন অফিসের কাজের ব্যস্ততায় ঘটনাটি ভুলে গেলেন তিনি।

২.

মনিরুলের অফিসটা তার বাসা থেকে ঠিক রিকশার দূরত্বে না। কিন্তু স্টাফ বাস ধরতে গেলে তাকে সকাল সাতটার আগে ঘুম থেকে উঠতে হবে। প'নে আটটার মধ্যে মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এতে করে ঝামেলাটা আসলে তার চেয়ে সুমীরই হবে বেশি। এত সকালে কাজের মহিলা আসে না।

মনিরুলের সহকর্মী হেলাল তারই প্রতিবেশী। চেইনস্মোকার। বাসে উঠে সিগারেট ধরানো যাবে না বলে মনিরুলের সাথে রিকশায় সহযাত্রী প্রতিদিন। যাওয়ার ভাড়া মনিরুল দিলে আসারটা দেন তিনি। এ ব্যবস্থায় আপত্তি নেই মনিরুলের। তাছাড়া কথা বলতে বলতে পথ ফুরিয়ে আসে দ্রুত। হেলালের বেশিরভাগ কথাই থাকে অফিস নিয়ে।

'বসের ইদানিং মেজাজ-মর্জি কেমন মনিরুল ভাই?'
'খেয়াল করি নাই তো।'
'ওমা! অফিসের কোন খোঁজখবরই দেখি রাখেন না!'
'কাজ করে কূল পাই না। এতদিকে দেখার সময় কখন!'
'খেয়াল রাখতে হয়। পামপট্টি কখন দিতে হবে সে টাইমিং জানতে হবে তো।'
'সে কি তোষামোদি পছন্দ করে? মনে তো হয় না।'
'হাহাহা! কী যে বলেন? শামস এই সেদিন চাকরিতে ঢুকে এত তাড়াতাড়ি প্রমোশন পেল কীভাবে? সূক্ষ্মভাবে তেল দিতে জানে, আর কিছু না। কিছুদিন পর দেখবেন ওকেই স্যার ডাকতে হচ্ছে।'
'শামস ছেলেটা কিন্তু করিতকর্মা আছে।'
'অমন তো অনেকেই আছে। আপনিই বা কম কীসে? এই, বামে রাখো।'

হেলাল ঠিকই বলেছে। অফিসের মূল চাকাগুলোর মধ্যে মনিরুল একজন। এ অফিসে অনেকদিন ধরে আছেন তিনি। প্রমোশন হয়েছে। তবে ১৫ বছরে যতবার হবার কথা ছিল ততবার না। তার সাথে ঢোকা লোকজন অন্য শাখার প্রধান হয়ে চলে গেছে।

লাঞ্চব্রেকে শামস এসে বসে মনিরুলের সামনে।

'একসাথে বসেই খাই, কী বলেন?'
'বসেন না, প্লিজ।'
'কী খাচ্ছেন? দেশি মুরগি, বাহ! ফার্মের মুরগি খেতে খেতে বিরক্ত লাগে। ভাবীর রান্না?'
'হ্যাঁ। নেন না একটু।'
'না না, থ্যাঙ্কস! স্যান্ডুইচ আনিয়েছি দু'টা।'
'শামস এখনো বিয়ে করেন নাই মনে হচ্ছে।'
'করেছি। বউও চাকরি করে। দুপুরের খাবার আনাটা ঝামেলা। তাছাড়া স্যান্ডুইচ খেলে দুপুরে ঘুম ধরে না।'
'ভাবী কোথায় আছেন?'
'সেও প্রাইভেট ব্যাঙ্কে। মার্কেন্টাইল। আচ্ছা, মনিরুল ভাই, গত অর্থবছরের এফডিআরগুলোর ফাইলটা বোধহয় আপনি গতকাল দেখে দিয়েছেন, তাই না?'
'হ্যাঁ দিয়েছি তো। কোন ঝামেলা নাকি?'
'না, কোন ঝামেলা না। স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন একটু আগে।'
'ও।'

শামসের খাওয়া হয়ে গেছে। সে উঠে পড়লো। তাকে ভালোই লাগে মনিরুলের। সাতাশ-আটাশের উদ্যমী তরুণ। এমন কেউ আশেপাশে থাকলে কাজ তাড়াতাড়ি এগোয়।
 
মনিরুল খাওয়া শেষে স্মোকিং জোনে গিয়ে দেখেন বসের হাতে সিগারেট। ব্যাপারটা নতুন। সাথে হেলাল।

'আসেন মনিরুল সাহেব! লাইটার পাচ্ছেন না? এই নেন।'
'থ্যাঙ্কস।'
'হেলাল সাহেবের সৌজন্যে সিগারেটটা ধরেই ফেললাম। তবে সিগারেট উনার হলেও লাইটারটা কিন্তু আমার। হাহাহা!'

মনিরুল মৃদু হাসলেন। হেলাল সাধারণত সিগারেট শেয়ার করতে পছন্দ করে না। ধূমপান দ্রুত শেষ করে তিনি ফিরে এলেন ডেস্কে।

৩.

শুক্রবার দুপুরের নীরবতা ভেঙে বেশ ক'বার কলিংবেল বেজে ওঠে। প্রচণ্ড বিরক্তি লাগে সুমীর। এ সময় কারো আসার কথা না। নিশ্চয়ই ফকির। খাওয়া ছেড়ে না উঠেও উপায় নেই। বেল বাজতেই থাকবে।

'তুমি বসো, আমি দেখছি', স্ত্রীর বিরক্তি বুঝতে পেরে মনিরুল বলেন।
'কয়েন-টয়েন থাকলে দিয়ে দাও তো একটা। যন্ত্রণা!'

মনিরুল একটা দশ টাকার নোট নিয়ে তিনতলার বারান্দা দিয়ে ফেলে দিতে গিয়ে দেখেন সেদিনের বৃদ্ধা ভিক্ষুক উপরে তাকিয়ে।

'স্যার, কিসু দ্যান।'
'আপনি একটু দাঁড়ান।'

মনিরুল নোটটা রেখে তার স্ত্রীকে এসে জিজ্ঞেস করলেন ফকিরকে দেবার মতো ভাত আছে কিনা। 

'ভাত দিতে হবে কেন?! খুচরা পয়সা দিলেই তো ঝামেলা মিটে যায়।'
'বুড়ি মহিলা। খাবার সময় আসলো তাই বললাম।'
'বুড়ি ফকিরটা, না? কানে কম শোনে, পরে আসতে বলেও লাভ নেই। তুমি বসো, আমি যাচ্ছি।'
'না না, ঠিক আছে। পয়সা দিয়ে দিচ্ছি।'

বারান্দায় ফিরে এসে একটা চকচকে পঞ্চাশ টাকার নোট ছুঁড়ে দিতে গিয়ে ভিখারিনীকে আর খুঁজে পেলেন না তিনি।

পরের শুক্রবার আসার আগে একটা পুরনো শাড়ি আলাদা করে রাখলেন মনিরুল। শতচ্ছিন্ন শাড়ি পরে বৃদ্ধা ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কোন বেল সেদিন বাজলো না। তার পরের সপ্তাহেও বৃদ্ধাকে পাড়ায় দেখা না যাওয়ায় একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন তিনি। দারোয়ান, মুদির দোকানদার আর বুয়াকে বৃদ্ধার বিবরণ দেয়াতে কাছাকাছি কিছু উত্তর পাওয়া গেল।

'এমন তো কত ফকিরই আহে।'
'না স্যার। কাজের লোক লাগবে আপনার? আমিই দিতে পারি। আমার জেলার লোক। বিশ্বস্ত।'
'ক্যামনে কই। ফইন্নির অভাব আসে ঢাকাত?'

৪.

'পরের মাস থেকে বোধহয় আর যাতায়াত করা হবে না আপনার সাথে', অফিস থেকে বের হয়ে একটা বেনসন ধরিয়ে হেলাল বলে।
'কেন?!'
'গুলশান ১-এ নতুন ব্রাঞ্চ খুলেছে জানেন তো। ওখানে যাচ্ছি। ম্যানেজার বানিয়ে দিলো।'
'বাহ! দারুণ খবর! খাওয়াচ্ছেন কবে?'
'ঝামেলা না বলেন? দূরে হয়ে গেল। সিএনজি না হয় উবার খুঁজতে হবে প্রতিদিন। খরচ বেড়ে গেল।'
'বেতনও তো বাড়লো।'
'কয় টাকাই আর! আপনার ভাবী আবার অলরেডি তাল তুলেছে ওদিকে বাসা নেয়ার।'
'নিয়ে নেন।'
'ঐসব এরিয়ায় বাসা ভাড়া কত আইডিয়া আছে আপনার? এখনকার বাসার অর্ধেক সাইজের কবুতরের খোপ সব। ভাড়া ডাবল!'
'চলেন রিকশা নেই।'
'আজ বাসার দিকে যাবো না মনিরুল ভাই। একটু কাজ আছে। ঐ খালি।'

একটা সাদা গাড়ি তখনই বের হলো অফিসের গ্যারেজ থেকে।

'আপনি মালিবাগের দিকে থাকেন না?' - জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে তার বস বলে ওঠেন মনিরুলের উদ্দেশ্যে। 
'জ্বি স্যার।'
'চলেন ড্রপ দেই। ওদিকেই যাচ্ছি।'
'না না, থ্যাংক্স!'
'শিওর?'
'জ্বি।'

ফেরার পথে প্যাকেটের বাকি সিগারেটগুলো শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাসার উল্টোদিকে রেলগেটের পাশে রিকশা রাখতে বললেন তিনি। নিকোটিনের রসদ নিয়ে ফেরা দরকার। মার্লবোরো লাইটের প্যাকেটটা নিয়ে পার হতে গিয়ে দেখলেন ট্রেনটাকে, বেশ কাছে। পর মুহূর্তে রাস্তার দিকে চোখ ফেরাতেই দেখলেন শেষ বিকেলের রোদে একটা চেনা অবয়বকে ছেঁড়া শাড়ি পরে রেললাইনের পাশ ঘেঁষে হেঁটে যেতে। 

---


মন্তব্য

হিমু এর ছবি

কিছু গল্প আছে পড়ে "ভালো লাগলো" বলা যায় না (সেখানেই সেসব গল্প সার্থক), এটাও তেমনই। এমন গল্প আরো লিখুন।

রাহিন হায়দার এর ছবি

উৎসাহ পেলাম। ধন্যবাদ হিমু ভাই!

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।