নরম কোমল দিলরুবা...

তিথীডোর এর ছবি
লিখেছেন তিথীডোর (তারিখ: মঙ্গল, ২৩/০৮/২০২২ - ৬:৪৫অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় প্রতি সপ্তাহে একদিন করে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের পলিসিতে গেছে অফিস।
আজ সপ্তাহের সেই দিন।

প্রেশার কমেটমে গতকাল রীতিমতো গিয়ানজাম লাগিয়ে দিয়েছিলাম৷
আমার এমনিতেই লো প্রেশার। দুপুরে লাঞ্চ করতে করতে চারটা বাজল। এরপর দেখি পেকে ভর্তা হয়ে যাওয়া সাগরকলার মতো ঘাড় চটাৎ চটাৎ করে পড়ে যাচ্ছে৷ 'বল বীর, বলো চির উন্নত মম শির' জাতীয় কোবতেটোবতে আওড়ে কোন লাভ হলো না।
রিসিপশনের আপাকে অতীব তমিজের সহিত বলিলাম-- জারা প্রেশার মেশিন লে আয়েঙ্গে প্লিজ?
মেপেটেপে দেখা গেলো কমলি বিগাড় গ্যায়া, মানে বেশ কমে গেছে।

কিন্তু সে তো গতকালকের ঘটনা, মানে দূর্ঘটনা। আজি সুপ্রভাতে হয়েছে সময়, এসেছি বাসবদত্তা।
ইটস আ ব্র্যান্ড নিউ ডে ম্যান! ফ্রেশ গুমোট বাতাস, নূতন শিডিউলে লোডশেডিং৷
আ নিউ ওয়ার্কিং ডে!
হোম অফিস হুয়া তো কেয়া হুয়া?

দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে লগ ইন করি৷ পাশের উইন্ডোর 'বদনবহি'তে অটোমান রাজত্বের মতো অটো আগমন ঘটে যায়। এমএস টিমে ক্যালেন্ডার বুক করতে বসি, ইন্টারভিউ : ২৪ আগস্ট- ডেপুটি ম্যানেজার - কমিউনিকেশান
কাল ২৪, তাহলে গত পরশু ছিল ২১ আগস্ট৷
রুম্পার জন্মদিন।

রুম্পা, আবাল্যের বন্ধু, জানে জিগার দোস্ত৷ মুজাই'র কাবিল কোহকাফির ডিমবন্দনার ভাষায় জানকে জান, চানকে মান। ডিমের মতোই সে এখন দুঃষ্পাপ্র‍্য, ট্রাম্পের প্রতিবেশী।

আমি মানুষটা বেশি সুবিধার নই৷ আমার সাথে বন্ধুত্বের সিদ্ধান্তও বেশি সুবিধার হবে না। অন্তত ক্লাস ফোর অব্দি রুম্পার এমনটাই ধারণা ছিল৷ ক্লাস ফাইভে উঠে কী হলো কে জানে, আমরা বিএফএফ হয়ে গ্যালাম!
য়্যাকদম তোমায় একদিন না দেখিলে, তোমার মুখের কথা না শুনিলে টাইপের সিনেমাটিক অবস্থা!

মাদমোয়াজেল রু ছিল ভয়ংকর রুপসী৷ আমি আজীবন সন্দেহাতীত লেভেলের যতটুকু অসুন্দর ছিলাম বা আছি, সে কৈশোর থেকেই তার ঠিক বিপরীত লেভেলের আগুনমুখো সোন্দরী। পরিবারে কচি বয়সে বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ থাকায় আমরা ধরেই নিয়েছিলাম মেট্রিক ফেরি পাড়ি দিতেই ওকেও প্রবাসী কারো সাথে পার করে দেওয়া হবে।
বন্ধুরা সব কলেজ থেকে ফিরে এপ্রোন খুলে তড়িঘড়ি করে বিয়ের দাওয়াত খেতে যাবো।

তখন চট্টগ্রামের সব সরকারি কলেজের ইউনিফর্ম ছিল সাদা এপ্রোন। মহসিন কলেজের সাদা পকেটে নীল পট্টি আর চট্টগ্রাম কলেজে সাদার ওপর সবুজ৷
রুম্পা সায়েন্সে, চট্টগ্রাম কলেজ।
আমি বাণিজ্য বসত লক্ষী, মহসিনে। দুটো কলেজ মুখোমুখি, জাস্ট রাস্তার এপার- ওপার!

মেডাম কলেজ পেরুলেন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুনোর আগেই বৈবাহিক সুত্রে পরবাসের টিকেট কাটলেন৷
ইউনাইটেড স্টেটস অফ আম্রিকা৷

তারো বেশ ক'বছর পর আমি পড়তে গেলাম সেদেশে। গ্রীষ্ম ছুটির অবকাশে যখন তাহাকে দেখতে ভার্জিনিয়া গেলুম, তখন একটি জামাই এবং একটি ছানাসমেত মাদামের ছোট্ট সুখের সংসার।
ছানা তখন নিতান্তই শিশু, সবে কোল চিনতে শিখেছে৷ নারীজাতি তার বিশেষ পছন্দের, ঝাঁপিয়ে আসে। সমলিঙ্গে আগ্রহ কম, না পারতে কাছে যায়।

পাঁচ বছর পরের কথা। দ্বিতীয়বারের মতো সন্তানসম্ভাবনায় সখী প্রবল উচ্ছ্বসিত।
আমি ইতিমধ্যে ব্যাক টু দি প্যাভিলিয়ন মানে দেশে ফিরে এসেছি, বিয়েশাদি করেছি। নিজে ছানাটানা ফুটাইনি তবে বিশেষত কন্যাশিশু বড়ো ভালবাসি৷ শুনলাম এবার মেয়ে হবে।
সখী মহা খুশি, আম্মো!

শ্যামচাচার দেশে চিন-পরিচিত মেলা লোক বাস করে। কারো হাতে ছোটি সি তোহফা পাঠাব ভাবছি, গরীবের দেওয়া খড়কুটো।
খালা হই তো! হাসি
দিন-তারিখ পেরিয়ে গ্যালো, কোন আপডেট নেই! সারাদিন কামলা খেটে ক্লান্ত হয়ে ফিরি, দিনরাতের ব্যবধান আর ব্যস্ততা খোঁজ নেবার ফুরসত দেয় না। তবু ছটফট করি, কী হলো হঠাৎ!

তারও সপ্তাহ দুই পর যখন চিন্তা দুঃশ্চিন্তায় রুপ নিয়েছে, রুম্পা নিজেই মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠাল একদিন।

আমার মেয়েটা মরে গেছে রে তিথী৷ একটাও নিঃশ্বাস না নিয়েই চলে গেছে৷

লেবারপেইনের বহু গল্প শুনেছি৷ ছোটবোন ডাক্তারি পড়ছে, গাইনিতে মেজর করার ইচ্ছে। ওয়ার্ড শুরু হবার পর থেকে সে টুকটাক অভিজ্ঞতা শোনায় আজকাল।
ডেলিভারি টেবিলে দশ মাসের সন্তান হারানোর গল্প মা ক্যাম্নে করবে! কোন আসুরিক শক্তিতে করবে?

কাছে থাকলে হয়তো ছুটে যেতাম, দুধ- সাবু রেঁধে নিয়ে যেতাম দু-চারদিন বাসায়। সান্ত্বনা না হোক, সঙ্গ দিতাম ক'দিন।
হায়, মাঝে ছিল সাড়ে সাত হাজার মাইল ভৌগলিক দূরত্বের দুস্তর পারাবার।

প্রায় দু'বছর পেরিয়ে গেছে। দুঃসহ স্মৃতি ভুলে আরেকটি শিশু এসেছে তার সংসারে। বেদনা যতোই সুগভীর হোক, তাকে পাশে সরিয়ে হাঁটতেই হয়।

আমাদের পরিবারেও শিশু আসছে একটি শিগগিরই৷ আমার নয়, কনিষ্ঠ ভ্রাতার। এও মেয়ে।
সক্কলে পরমানন্দিত!
আমরা বেবিকটের ডিজাইন দেখি, শিশুর সুন্দর নামের বই ঘাঁটি, রুপোর নূপুর অর্ডার দেওয়ার কথা ভাবি।

মাঝে একুশে আগস্ট একটি অদেখা শিশুমুখের জন্য প্রিয়জনের দীর্ঘশ্বাসের কথা মনে করিয়ে দিয়ে যায়...
___________________________________________________________________________
নরম কোমল দিলরুবা
২৩ আগস্ট, সন্ধ্যা ছ'টা 


মন্তব্য

Rahman Faruk এর ছবি

সুন্দর লিখছেন।

তিথীডোর এর ছবি

পড়ার জন্য ধন্যবাদ! হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

নৈ ছৈ এর ছবি

কি কষ্ট!

তিথীডোর এর ছবি

'অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার!'

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

হাসিব এর ছবি

আমার পরিবারে এরকম ঘটনা আছে। আমি প্রিয়জনের সন্তান আসছে এরকম সম্ভাবনায় কখনো উচ্ছ্বাস দেখাতে পারি না। কুঁকড়ে থাকি।

তিথীডোর এর ছবি

কিচ্ছু বলার নেই...

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

তিথীডোর এর ছবি

নারদ কহিলা হাসি,
ঘটে যা তা, সব সত্য...

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

স্পর্শ এর ছবি

মন ছুঁয়ে গেল লেখাটা।


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

তিথীডোর এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ! হাসি

________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"

নীড় সন্ধানী এর ছবি

লেখাটা পড়তে শুরু করে ব্যাপারটা এমন জায়গায় এসে ঠেকবে কল্পনাও করিনি। মন খারাপ

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

মর্ম এর ছবি

জীবনে কত অভিজ্ঞতারই কোন মন্তব্য হয় না! মন খারাপ

~~~~~~~~~~~~~~~~
আমার লেখা কইবে কথা যখন আমি থাকবোনা...

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।