কতিপয় ক্রীতদাস

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি
লিখেছেন ষষ্ঠ পাণ্ডব (তারিখ: বুধ, ২৪/১১/২০২১ - ১২:৪৭পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

(অ)

আতর আলী একটা সরকারী সংস্থাতে নৈশপ্রহরীর চাকুরি করতেন। নব্বইয়ের দশকে প্রেসক্রিপশনওয়ালারা যখন বললো, লোক কমাও ইউনিট কমাও দক্ষতা বাড়াও লাভ বাড়াও – তখন সংস্থায় সংস্থায় ‘সোনালী করমর্দন’-এর সুবাতাস বইতে লাগলো। সব সংস্থাতেই প্রেসক্রিপশনওয়ালাদের আড়কাঠি থাকে। তাদের কেউ কেউ আবার গরিবের বন্ধু শ্রমিকনেতার রূপে। অমন এক গরিবের বন্ধু আতর আলী আর তার মতো আরও কয়েক জনকে সোনালী করমর্দনের সুফল বোঝাতে সক্ষম হলেন। তাতে আতর আলী আর ঐ কয়েকজন সোনালী করমর্দন করে স্বেচ্ছায় অবসরে গেলেন। মোট যা টাকা পাবার কথা তার একটা ভাগ গরিবের বন্ধু নিয়ে গেলেন। বাকি টাকা যা পাওয়া গেলো তাতে আতর আলীর মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। একসাথে এতো টাকা তিনি কখনো দেখেননি। তিনি নিজে ভূমিহীন ক্ষেতমজুর পরিবারের ছেলে, থাকার ভিটেমাটি ছাড়া কোনো জমিজিরেত নেই, অন্য কোনো আয়ের উৎসও নেই। গরিবের বন্ধু বলেছিলেন, এক বারে যা পাবি তাতে বাকি জীবন ঠ্যাঙের উপরে ঠ্যাঙ তুলে খেতে পারবি। টাকা হাতে পেয়ে আতর আলীরও তাই মনে হলো। কিন্তু বাস্তবের দুনিয়াটা যে ভিন্ন রকমের সেখানে নগদ টাকার ভরসা নেই, মুদ্রাস্ফীতির লাগাম নেই সেই জ্ঞান আতর আলীকে কেউ দেয়নি।

নৈশপ্রহরীর চাকুরির বিড়ম্বনাটা হচ্ছে সেখানে রাতে কাজ করতে হয় তো বটেই সাথে দিনেও কাজ করা লাগে। এই পদে লোকে বিশেষ কাজ করতে চায় না বলে লোক সঙ্কট থাকে, ছুটিছাটাও প্রায় মেলে না। দিনে দপ্তরের কাজ বিশেষ করতে না হলেও সংসারের কাজ করতে হয়। ফলে বিশ্রামটা আর ঠিকমতো হয়ে ওঠে না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে নৈশপ্রহরীর চাকুরি করলে অনির্দিষ্টকাল জৈবিক চাহিদা মেটানোর উপায় থাকে না। জীবনের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হলে সেখানে অস্বাভাবিকতার আবির্ভাব ঘটে। হঠাৎ অবসর পাওয়ার পরে আতর আলীর মনে হলো এই বিষয়ে নিজেকে অনেক বঞ্চিত করেছি। ইয়ারদোস্তদের আড্ডায় এই ব্যাপারে হালকা আভাস দিতে সবাই যেন ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সবার ক্রমাগত প্ররোচণায় আর নিজের উপোসী মনের তাগিদে আতর আলী আরেকটি বিয়ে করে ফেললেন। স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় স্ত্রী অনেক অল্পবয়সী এবং তাকে পেতে কন্যার বাবাকে মোটা কনেপণ দিতে হলো। ঘটক আর ইয়ারদোস্তরাও কিছু কামিয়ে নিলেন – নগদ বা অন্য কিছু। এতে আতর আলীর সোনালী করমর্দনে পাওয়া টাকার স্তুপ এক বছর যেতে না যেতে কর্পূরের মতো উবে গেলো।

আতর আলী তাঁর পুরনো কর্তাদের খোঁজে নামলেন। তাঁদের কেউ কেউ স্বাভাবিকভাবে অবসরে গেছেন, কেউ আতর আলীর মতো সোনালী করমর্দনের ছোঁয়া পেয়েছেন। জীবনযাত্রার আগের মান বজায় রাখার জন্য তাঁদের কেউ নতুন চাকুরিতে ঢুকেছেন, কেউ ব্যবসা শুরু করেছেন। আর যারা গোছানো স্বভাবের ছিলেন তাঁরা আখের গুছিয়ে আমেরিকা-ক্যানাডা-ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড চলে গেছেন। পুরনো কর্তাদের একজনের কারখানায় আতর আলী আবারও নৈশপ্রহরীর চাকুরি পেলেন। এই কারখানা আতর আলীর নিজের বাড়ি থেকে আড়াইশ’ কিলোমিটার দূরে। মেসবাড়িতে থেকে আতর আলীর আর পোষায় না। বাড়িতে ফেরার উপায় নেই। দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর শেষ সম্বল যা কিছু ছিল তা নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে। শোনা যাচ্ছে সে নাকি ত্বালাকের মামলা করবে। আতর আলী এতো দিনে দুনিয়ার হালচাল অনেক কিছু শিখে গেছেন, তাই একদিন তিনি কর্তার কাছে কেঁদে পড়লেন। বেকার থাকার সময় তাঁর যে দেনা হয়েছিল সেই দেনার দাবিতে পাওনাদারেরা নাকি তাঁর পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করছে। আতর আলী নিজে বাড়িতে নেই এখন তাঁর স্ত্রী বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবে? তাহলে এর সমাধান কী? আতর আলী বললেন, মোট দেনা দেড় লাখ টাকা। তার মধ্যে একমাত্র ধানী জমিটা বিক্রি করে পাওনাদারদেরকে এক লাখ টাকা শোধ দেয়া হয়েছে। এখন স্যার যদি দয়া করে তাঁকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেন তাহলে আতর আলীর পরিবার বেঁচে যায়। কর্তা ঘাঘু লোক, জীবনে বহু লোক তিনি চড়িয়ে খেয়েছেন। তিনি জানেন আতর আলীর দাবির পুরোটাই বানোয়াট। তাঁর গ্রামে একজনকে খোঁজ নিতে পাঠালেই সব সত্য বের হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি ভাবলেন এই সুবাদে আতর আলীকে বরং পঞ্চাশ হাজার টাকায় কিনে নেয়া যাক।

কর্তা আতর আলীকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার দিলেন, সাথে কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে রাখলেন। আতর আলীর টাকা নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাবার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি টাকা নিয়ে গেলেন মেসবাড়ির রাঁধুনীর বাড়িতে। পঁচিশ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি রাঁধুনীর কিশোরী মেয়েকে বিয়ে করে কারখানার কাছের এক বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া করে সেখানে তুললেন। বাকি পঁচিশ হাজার টাকা দিয়ে ঘরের কিছু জিনিস কেনা হলো, কিছু দিন আয়েশ-স্ফূর্তি করা হলো। এবং আতর আলী পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁর কর্তার ক্রীতদাসে পরিণত হলেন।

(আ)

লিখন বেশ মেধাবী মানুষ। নামডাকওয়ালা বিজনেস স্কুল থেকে সেলস এন্ড মার্কেটিং-এর ওপর ডিগ্রি নিয়ে একটা বড় দেশী কোম্পানীর সেলস্‌ বিভাগে ভালো পদে চাকুরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ প্রেমিকা কবিতাকে বিয়ে করেছেন। তাঁদের সংসারে একটি কন্যাও আছে। দেশে অনেক কোম্পানীতে সেলসের চাকুরিতে বৈধ আয়ের সুযোগ প্রচুর। বেতন যেমন তেমন বিক্রয়ের ওপর কমিশন আর নানা রকমের বোনাসে যা আয় হয় তা মূল বেতনের কয়েক গুণ হয়ে যায়। সময়টা লিখনের জন্য ভালো যাচ্ছিল, তিনি নিয়মিত প্রচুর আয় করতে লাগলেন। সমস্যা হচ্ছে এই প্রকার আয়ের যে স্থিরতা নেই লিখন সেটা মাথায় রাখলেন না।

ইউরোপীয় উপনিবেশ আমলে এদেশে যে দালাল বেনিয়া শ্রেণী গড়ে ওঠে তাঁদের কেউ কেউ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা, সূর্যাস্ত আইন ইত্যাদির সুবাদে রাতারাতি সামন্ত প্রভু হয়ে ওঠেন। সামন্ত হয়ে ওঠার পর পূর্ব জীবনের বঞ্চনার শোধ নিতে তাঁদের বেশিরভাগ জন বিলাস ব্যসনে গা ঢেলে দিতে থাকেন। এর ফল স্বরূপ তাঁদের অনেকে দ্রুত সূর্যাস্ত আইনের খাঁড়াতে কাটা পড়তে থাকেন। একটা সময়ে দেখা গেলো বর্তমান জমিদারের চেয়ে সাবেক জমিদারের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। বাজারে তার চেয়েও বহুগুণে বেশি দেখা গেলো জমিদারের অমুক তমুক আত্মীয়দেরকে। এই দুই গ্রুপের বড় অংশের ট্যাঁকে কড়ি বিশেষ না থাকলেও বদঅভ্যাসগুলো ঠিকই রয়ে গেলো। এদের মধ্যে যারা চাকুরি বা ব্যবসা করে দুটো পয়সার মুখ দেখতে শুরু করলেন তাঁরা এবং তাঁদের দেখাদেখি উঠতি ধনীরা হাতে পয়সা এলেই ‘বাঁধা রাঁড়’ রাখা শুরু করলেন। এসব ঘটনার একশ বছর পরেও অথবা জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পঞ্চাশ বছর পরেও নাই নাই করেও নানা রূপে এই চর্চ্চা টিকে থাকলো। সুতরাং হাতে যথেষ্ট পরিমাণে ‘আৎকা’ পয়সা আসার পরে লিখন ভাবলেন একা কবিতাকে দিয়ে আর পোষাচ্ছে না।

অতএব লিখন সুমাইয়ার সাথে জড়িয়ে পড়লেন। সুমাইয়া এদেশের হেন কোন ইন্ডাস্ট্রি নেই যেখানে কাজ করেননি, ফলে হাজার হাজার মানুষ তাঁকে এক নামে চেনেন। জনসংযোগ, বিপণন, বিক্রয়, গ্রাহকসেবা, মানবসম্পদ, প্রশাসন ইত্যাদি প্রায় সব বিভাগে তিনি কাজ করেছেন। নিয়মিত চাকুরি বদলের মতো তিনি নিয়মিত সঙ্গী বদল করে থাকেন। তিনি কারো সাথে জড়িয়ে পড়ার মতো মেয়ে নন্‌, কিন্তু তিনি ভাবলেন এবার সময় এসেছে গুছিয়ে বসার। তাঁকে নিজের এবং প্রথম জীবনের বিবাহজাত পুত্রের ভবিষ্যতের কথা ভেবে গুছাতে হবে। সুতরাং তিনি লিখনকে উত্তমরূপে দোহনের সিদ্ধান্ত নিলেন। লিখন সুমাইয়ার প্রবল স্রোতে ভেসে গেলেন, সেই সাথে তাঁর যাবতীয় আয় উবে যেতে লাগলো। লিখন যত বেশি পরিশ্রম করেন, ততো বেশি আয় করেন, তারও বেশি সুমাইয়ার কাছে ব্যয় হয়ে যায়। এক সময় তিনি আর কুলিয়ে উঠতে পারলেন না। তখন কয়েকটা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ সুদে ব্যক্তিগত ঋণ নিলেন, ক্রেডিট কার্ডগুলো আরও আগেই তাদের লিমিট ছুঁয়ে ফেলেছিল। লিখন যখন দেখলেন ক্রেডিট কার্ডের মাসিক বিল, ঋণের ইএমআই ইত্যাদি পরিশোধ করার পরে হাতে যা থাকছে তাতে দশদিনও চলা যাচ্ছে না তখন তিনি ভিন্ন উপায় অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নিলেন।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য বিক্রি করা সারা দুনিয়ায় প্রচলিত একটি বহুল ব্যবহৃত উপায়। লিখন প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য বিক্রি করলেন, কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু পাওয়া গেলো না। এদেশে মানুষ পয়সা দিয়ে তথ্য কিনতে অভ্যস্থ নন্‌। এই দফা লিখন কিছু ক্রেতা যোগাড় করলেন যাদেরকে বড় অঙ্কের টাকার পণ্য বাকিতে দেয়া হলো। লিখন ঐ ক্রেতাদের কাছ থেকে বাকির পরিমাণের এক-চতুর্থাংশের সমান অর্থ নগদে নিয়ে নিলেন। ক্রেতারা নির্দ্বিধায় লিখনকে টাকা দিয়ে দিলেন, কারণ তাঁদের সাথে কথাই হয়েছে কোম্পানীকে কোন পাওনা পরিশোধ করা হবে না। কিন্তু কোম্পানীর অনাদায়ী পাওনার পরিমাণ বাড়তে থাকায় এই পদ্ধতি বেশি দিন চালানো গেলো না। লিখন তখন কোম্পানীর পাওনা আদায়ে নামলেন। তিনি বিভিন্ন ক্রেতার কাছ থেকে বড় পাওনার ছোট ছোট অংশ নগদে আদায় করতে লাগলেন কিন্তু সেই টাকা আর কোম্পানী অ্যাকাউন্টসে জমা দিলেন না। এই মাপের দুর্নীতি আসলে বেশি দিন করা যায় না, অতএব লিখন ধরা পড়লেন। লিখন ধরা পড়ার পর থেকে সুমাইয়া তাঁর সাথে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ করে দিলেন। তাঁর ফ্ল্যাটে লিখনকে আর ঢুকতে দেয়া হলো না।

কোম্পানী কর্তৃপক্ষ জানেন তস্করের বিরুদ্ধে মামলা করে, তাকে জেল খাটিয়ে আসলে কোন লাভ হয় না, এতে পাওনা টাকা উদ্ধার হয় না। সুতরাং লিখনের বিরুদ্ধে তাঁরা কোন মামলা করলেন না। লিখন যে ফ্ল্যাটটি কেনার দশ বছরের ইএমআইয়ের মধ্যে সাত বছর পরিশোধ করেছেন সেটা কোম্পানীকে বিনা মূল্যে দিয়ে দিতে হলো। একই অবস্থা হলো ইএমআই শোধ করা গাড়িটার ক্ষেত্রে। সাব্যস্ত হলো লিখনের চাকুরি থাকবে, সেখানে তিনি খুব সামান্য বেতন পাবেন কিন্তু তাঁকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণে পণ্য বিক্রয় করতে হবে এবং পুরনো পাওনা আদায় করে দিতে হবে। প্রতি মাসের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয়া হবে এবং যে কোন মূল্যে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। এই ব্যবস্থা ততদিন ধরে চলতে থাকবে যতদিন পর্যন্ত না লিখনের বিক্রয় ও আদায় থেকে প্রাপ্ত মোট অর্থের এক শতাংশের পরিমাণ তাঁর আত্মসাৎকৃত অর্থের সমান হয়। এভাবে লিখন তাঁর কোম্পানীর ক্রীতদাসে পরিণত হলেন।


মন্তব্য

সত্যপীর এর ছবি

এতে আতর আলীর সোনালী করমর্দনে পাওয়া টাকার স্তুপ এক বছর যেতে না যেতে কর্পূরের মতো উবে গেলো।

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমি একটা পার্ট টাইম কাজ করতাম দুকানে। সেইখানে লটারি টিকেট বিক্রি হইত। একবার আমার সাথের ছেলেটা এক কাস্টমারকে দশ হাজার না কত ডলারের টিকেট বেচে। সেই লোক ছিল বেপক দরিদ্র, হটডগ দিয়ে লাঞ্চ করত (আমিও করতাম অবশ্য কিন্তু সেইটা ভিন্ন প্রসঙ্গ খাইছে ) আর কমদামি বিড়ি ফুঁকত। টিকেট জিতার পরে সে লিমো ভাড়া করে গার্লফ্রেন্ডদের (বহুবচন চোখ টিপি ) নিয়ে ক্যাসিনো যাইত দেখতাম স্যাটার্ডে নাইটে। মাসখানেক পরে আবার সেই হটডগ লাঞ্চ আর সস্তা বিড়ি, কেননা টেকা ফিনিশ!

...
(ই) এর জন্য অপেক্ষা করলাম।

..................................................................
#Banshibir.

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

যে আমলে কেবল পিডিবি শহরাঞ্চলে ইলেকট্রিসিটির মা-বাপ ছিল সেই আমলে ঝড়-বৃষ্টি-বাতাস হলে কোন না কোন বাসার বা কোন পাড়ার ইলেকট্রিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তখন নিকটস্থ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে বা গিয়ে সাধ্য সাধনা করে লাইনম্যানদেরকে ডেকে এনে সেগুলো ঠিক করতে হতো। লাইনম্যানেরা দুই চকার ঠেলাগাড়িতে বিশাল লম্বা বাঁশের মই এনে লাইন ঠিক করতেন। তবে সেজন্য তাদেরকে ভালো বখশিশ দিতে হতো। এভাবে লাইনম্যানদের কিছু আয়রোজগার হতো। দুর্নীতিগ্রস্থ লাইনম্যানদের ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ দেয়ার জন্য বা অবৈধ সংযোগ নেয়া লোকদের কাছ থেকে 'মাসিক বিল' থেকে আরও ভালো আয় হতো। তো রফিক অমন একজন লাইনম্যান ছিলেন যার 'উপরি আয়' মন্দ ছিল না। প্রতি বছরে প্রায় মাস তিন-চারের জন্য রফিক বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেতেন। আসলে ঠিক উধাও না। শহরের কোন না কোন বস্তিতে তিনি কোন না কোন এক বান্ধবীর সাথে ঐ সময়টা কাটাতেন। প্রতি বছর বান্ধবী পালটে যেতো। সারা বছর কামানো 'উপরি আয়' ফুরিয়ে গেলে রফিক আবার বউ-বাচ্চার কাছে ফিরে যেতেন।

(ই)-নিয়ে এখনো কোনো ভাবনা নেই। নতুন কোন ক্রীতদাসের সন্ধান পেলে অথবা কোনো একদিন ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে লম্বা সময় কাটালে লিখে ফেলতে পারি। কোনো নিশ্চয়তা নেই।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

সমাজের দুই স্তরের দুই ধরণের বয়ানে, ক্রীতদাস তৈরির প্রক্রিয়াটি খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। এসব জেনে-বুঝে প্রশ্ন জাগেঃ

১) মানুষ কি নিজের ভাগ্য আদৌ পরিবর্তন করে তৃপ্তি পেতে চায়, নাকি প্রবৃত্তির দাসত্ব করেই খুশি থাকতে চায়?

২) ইলিয়াসের ‘দুধেভাতে উৎপাত’ একরকমের বাস্তবতা, এটা সত্যি। সেসময় মানুষ দারিদ্র্যের কষাঘতে মহাজন-খাতকদের ঋণদাস হতো। কিন্তু বর্তমানে বাস্তবতা তো একটু হলেও ভিন্ন। ‘রুটি খাবার দারিদ্র্য’ আর ‘পাউরুটি খেতে চাইবার দারিদ্র্য’ সম্পূর্ণ আলাদা মানসিকতা নয় কি? আর এই ফাঁদে পড়েই কি মানুষ ক্রীতদাস হচ্ছে?

এইসব এলেমেলো ভাবনা ভিড় করে যাচ্ছে মাথায়। চিন্তা-উসকে দেয়ার মতো এই লেখাটার জন্যে আপনাকে অনেক, অনেক ধন্যবাদ।

স্বরূপ-সন্ধানী
---------------------------------
অন্ধকারে সবচেয়ে সে শরণ ভালো,
যে-প্রেম জ্ঞানের থেকে পেয়েছে গভীরভাবে আলো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

১। মানুষ আসলে কী চায় সেটা মানুষই বলতে পারবে। কেউ প্রিয়জনদের জন্য নিজের সর্বস্ব পণ করেন, কেউ আবার নেশার জন্য প্রিয়জনকে বেচে দেন। মানুষে মানুষে যেমন হেরফের হয়, তাদের চাওয়াতেও হেরফের হয়।

২। দারিদ্র্যের সংজ্ঞা পালটায় - স্থান, কাল, পাত্রভেদে। এক কালে মানুষ মহাজন-পোদ্দারদের ঋণের জালে ফাঁসতেন, এখন হয়তো এনজিও-ক্ষুদ্র ঋণ-আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির জালে ফাঁসেন। যে দু'প্রকারের কথা বললাম তার বাইরে আরও বহু প্রকারের ক্রীতদাস আছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে আরও একটা ক্রীতদাস যে দেখতে পাবো না তার নিশ্চয়তা নেই।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

guest_writer এর ছবি

হাততালি

স্বরূপ-সন্ধানী
---------------------------------
অন্ধকারে সবচেয়ে সে শরণ ভালো,
যে-প্রেম জ্ঞানের থেকে পেয়েছে গভীরভাবে আলো।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

টেস্ট!


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

টেস্ট কমেন্ট।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

অতিথি লেখক এর ছবি

এই মূহুর্তে মীজানুর রহমানের “ঢাকা পুরান” পড়ছিলাম পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক না হলেও তার একটা অংশ তুলে দেবার লোভ সামলাতে পারলাম না।

বিকালে খেলা সাঙ্গ হলে সারাদিনের চিৎকার ও উত্তেজনায় পর্যদুস্ত দর্শক ও বাজি ধরিয়ে দলটি ফিরে যেত যে যার ডেরায়-বাজি হেরে কারও প্রতিবারের মতো মিথ্যা শপথ- ‘খোদাকি কসম, ইয়ে জিন্দেগি মে আর খেলুঙ্গা নেহি’ কিংবা ‘মায়ের কসম খাইয়া কইতেছি, রেসের নাম ভি আর জবানে আইলে তরা হালায় কিয়া বলু- কুত্তাকা নাম সে পুকারো’- এমনি কাঁচি উর্দু-বাংলার ভিয়েন দেওয়া সব সংলাপ কানে আসতো। ঢাকার লোকদের মুখে শুনেছি, এই রেস খেলতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে যেমন তেমন খুনখারাবিও ঘটেছে অনেক। এক পান্টার তার ভাইজির গলার চেন নেওয়ার জন্য তাকে হত্যা করেছিলো। স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়েছে কেউ কেউ। দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছে অনেকে। শেয়ারে টিকেট কিনে জয়ী হলে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে খুনোখুনি পর্যন্ত হয়ে যেত। স্ত্রী কিছু বললে প্রহারই ছিল তার একমাত্র পুরস্কার।

কোন কিছু পাবার লোভেও মানুষ ক্রীতদাস হয়ে যেতে পারে তাই না??
- আতোকেন

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

হ্যাঁ, তাতো পারেই। নেশার জন্য (তা যে কোন কিছুর নেশা হোক), রিপুর তাড়নায় কত কারণেই যে মানুষ নিজেকে বেচে দিতে পারে। আমরা কি দেখিনি কতো জনে কতো তুচ্ছ স্বার্থে বা নগণ্য মূল্যে দেশ বেচে দিয়েছে! আমরা কি দেখিনি আমাদের সোনার দামের দিনগুলো কী অবলীলায় তামার দামে বিক্রি হয়ে গেছে! ক্রীতদাস হওয়া খুব সোজা। বরং নিজের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা কঠিন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

guest_writer এর ছবি

একদম ঠিক বলেছেন।

আপনার কথায় শওকত ওসমানের 'ক্রীতদাসের হাসি' মনে পড়ে গেল।

মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তাকে ক্রীতদাস বানানো যায়। কিন্তু তার হাসিকে, মানে তার স্বাধীনতা থাকার অদম্য ইচ্ছাকে, দাস বানানো অত্যন্ত কঠিন।

স্বরূপ-সন্ধানী
---------------------------------
অন্ধকারে সবচেয়ে সে শরণ ভালো,
যে-প্রেম জ্ঞানের থেকে পেয়েছে গভীরভাবে আলো।

আয়নামতি এর ছবি

রূঢ় সত্যি মন খারাপ

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।