জিয়াউর রহমান, ভারতে গ্যাস রপ্তানির প্রস্তাব এবং পাশ্চাত্যের পরিকল্পনা

নৈষাদ এর ছবি
লিখেছেন নৈষাদ (তারিখ: সোম, ৩১/০৫/২০২১ - ৪:৩৮অপরাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

সম্প্রতি ‘জিয়াউর রহমান ভারতকে গ্যাস বেচতেও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন, বলছেন একজন ভারতীয় কূটনীতিক’ শিরোনামে একটা খবর পড়লাম বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে। গ্যাস সেক্টর নিয়ে জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে আরও কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল, সেদিকে কিছুটা আলোকপাত করা যাক।

বিবিসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে ভারত সফরের সময় সে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলেন। সেই প্রতিবেদনে ঢাকায় নিযুক্ত তখনকার হাই-কমিশনার মুচকুন্দ দুবের ভাষ্যে লেখা হয়, "গ্যাস বিক্রির সব কথাবার্তা কিন্তু পাকা হয়ে গিয়েছিল, শুধু দামটা ছাড়া। একাশিতে জিয়াকে যখন হত্যা করা হয়, তখন ওই দাম নিয়েই আলোচনা চলছিল। কিন্তু তাঁর হত্যার পর সব ভেস্তে যায়। তার আগে কী পরিমাণ গ্যাস রপ্তানি হবে, কোথায় কারা পাইপলাইন বসাবে সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তখন তো আজকের মতো মুক্ত বাজার ছিল না, জিয়া চাইছিলেন বাজারদরে গ্যাস বেচতে, যেটা নিরূপণ করা কঠিন ছিল - আর আমরা বলছিলাম কস্ট প্লাস ফর্মুলায় দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে গ্যাসের দাম ঠিক হোক।"

আমরা জানি অধুনা-অবলুপ্ত ভারতীয় রাজনৈতিক দল ‘জনতা পার্টি’ ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর এবং মোরারজি দেসাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জিয়াউর রহমানের সাথে সুসম্পর্কের সূচনা হয়। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যে আন্দোলন চলছিল, মোরারজি দেসাই সেটাও কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন।

তবে জানা যায়, ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করার পর গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব দেয়া হয় (মূলত বিক্রির প্রস্তাব প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে আসে)।

১৯৮১ সালে প্রকাশিত ইকোনমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলির এক প্রতিবেদনে গ্যাস বিক্রির ব্যাপারে আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায় (১)। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে তখনকার সম্ভাব্য গ্যাসের মজুদ ছিল ১০ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট)। জিয়াউর রহমান পরবর্তী এক দশকে এর এক-দশমাংশ, অর্থাৎ ১ টিসিএফ গ্যাস ভারতে রপ্তানির প্রস্তাব দিয়েছিলেন (যা প্রতিদিন ৫ লাখ ব্যারেল তেলের সমতুল্য বলে সেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে)।

গ্যাস রপ্তানির জন্য বাখরাবাদ থেকে কোলকাতার প্রাপ্তিস্থান পর্যন্ত ১৭৫ মাইল দৈর্ঘ্যের (প্রায় ২৮২ কিমি) পাইপ-লাইনের প্রস্তাব ছিল। সেই পাইপ-লাইনের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৩০০ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংকের কাছে পাইপ-লাইনের অর্থায়নের প্রস্তাব ছিল।

জিয়াউর রহমান অবশ্য ভারতের সাথে ‘ব্যালেন্স অভ পেমেন্ট’ সামঞ্জস্যের যুক্তি দিয়েছিলেন। তবে একই সময়ে জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাকি গ্যাস এলএনজি আকারে (লিক্যুইফাইড ন্যাচারেল গ্যাস) রপ্তানি করার সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছিল। তবে এর শর্তগুলি অবাক করার মত। এলএনজির প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনা যেহেতু খুবই খরচসাপেক্ষ (তখনকার হিসাবে দেড় বিলিয়ন ডলার), সেই দায়িত্ব আমদানিকারী দেশেরই নেয়ার কথাবার্তা চলছিল। বিনিময়ে আমদানিকারক দেশকে দেবার কথা ছিল সব গ্যাসের ‘এক্সক্লুসিভ রাইট’।

১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে তখনকার জ্বালানিমন্ত্রী আকবর হোসেন সংসদে ভারতে গ্যাস রপ্তানির প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। অবশ্য দলের মধ্যেই এর কঠোর বিরোধিতা ছিল।

তবে, ১৯৭৮ সালের ২৫ মার্চে প্রকাশিত ইকোনমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলির এক বিশেষ রিপোর্টে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। (২)। সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠান International Corporation of Houston Texas (আইসিহেইচ) বাখরাবাদে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের এলএনজি প্ল্যান্ট বসানোর জন্য সামরিক আইন প্রশাসকের সাথে চুক্তি করতে যাচ্ছে। সেই এলএনজি জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রে যাবে। (তখন এস্টিমেটেড মজুদ ধরা হত ৩০ টিসিএফ)

আইসিহেইচের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলি এ ধরনের এলএনজি প্ল্যান্ট তখন কলাম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা এবং আলজিরিয়ায় অপারেশনে ছিল (দেশগুলি খেয়াল করতে হবে)। এই বিনিয়োগের ব্যাপারে যুক্তরাজ্য আরও গভীরভাবে জড়িত ছিল। ‘ইন্টারেস্ট’ যাতে অক্ষত থাকে সে ব্যাপার নিশ্চিত করার জন্য SAS কর্নেল গিবন ঢাকায় এসেছিলেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহান নিজেও সরাসরি কথাবার্তায় জড়িত ছিলেন।

তবে প্রতিবেদনে ‘West’s search for a Suharto’ শিরোনামের বিশ্লেষণে প্রশ্ন করা হয়েছে, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কী সেই সুহার্তো হতে পারবে? শেষমেষ হয়ত জিয়াউর রহমানের উপর আর তেমন ভরসা করতে পারেনি পশ্চিমিরা।

অবশ্য, ভারতে রপ্তানির কথাবার্তার সময় আরেক প্রাক্তন খেলোয়াড় খন্দকার মোশতাক এই সুযোগে পাদপ্রদীপে আসার একটা শেষ চেষ্টা হয়ত করেছিলেন। ভারতে গ্যাস রপ্তানির প্রতিবাদে খন্দকার মোশতাক ‘আমরণ অনশনের’ ডাক দিয়েছিলেন।

(১) Marcus Franda, “Ziaur Rahman and Bangladeshi Nationalism”, Economic and Political Weekly Vol. 16, No. 10/12, Annual Number Mar 1981

(২) Murder in Dacca: Ziaur Rahman's Second Round N. M. J., Economic and Political Weekly Vol. 13, No. 12, Mar. 25, 1978


মন্তব্য

ডা. মো. রুমী আলম  এর ছবি

তখনকার অনুমিত মজুদের সাথে বর্তমান মজুদের উল্লেখযোগ্য কোন ফারাক আছে? অনেক ধন্যবাদ।

নৈষাদ এর ছবি

বাংলাদেশ হাইড্রোকার্বন ইউনিটের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে মোট মজুদের পরিমান ১০ টিসিএফের মত (মজুদের প্রকারভেদ আছে)। আশির দশকের পর অনেক নতুন মজুদ অবিষ্কৃত হয়েছে, মজুদ ব্যবহৃত হয়েছে, এবং এস্টিমেট পরিবর্তিত হয়েছে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

কোন প্রকার রেফারেন্স ছাড়া একটা ভিত্তিহীন গল্প বলতে পারি, বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। পশ্চিমবঙ্গে যখন বামেরা প্রথমবারের মতো পুরোপুরি ক্ষমতায় আসে তখন তাদের এক নেতার তরুণ ব্যবসায়ী পুত্রের সাথে এদেশের একজন ব্যবসায়ীর সখ্য ছিল। এদেশী জন আবার উত্তরপাড়ার ঘনিষ্ঠজন, তৎকালীন জ্বালানীমন্ত্রীও তাদের একজন (সাবেক)। আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস ব্যবসায়ীচক্র এই দুই জনের উপর ভর করে। ফলে কথাবার্তায় বেশ অগ্রগতি হয়। 'জনতা সরকার'-এর পতনের পর 'প্রিয়দর্শিনী সরকার' ক্ষমতায় আসলে একটু ঝামেলা হয়ে যায়। পূর্বদেশে ততদিনে কালো চশমার প্রতিপত্তি কমতে শুরু করেছে। তিনি নিহত হবার পর উত্তরপাড়ার ক্ষমতা কেন্দ্র পালটে যায়। ফলে বিষয়টা আর আগাতে পারে না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ঈয়াসীন এর ছবি

চলুক

------------------------------------------------------------------
মাভৈ, রাতের আঁধার গভীর যত ভোর ততই সন্নিকটে জেনো।

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।