তথাকথিত ‘ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রি’র নামে দুর্বৃত্তায়ন এবং দেশের অ্যামাজন-আলীবাবা

নৈষাদ এর ছবি
লিখেছেন নৈষাদ (তারিখ: বিষ্যুদ, ১৮/১১/২০২১ - ৯:৫০পূর্বাহ্ন)
ক্যাটেগরি:

গণমাধ্যমের কল্যাণে তথাকথিত ‘ই-কমার্সের’ নামে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বড় মাত্রার প্রতারণার কথা ইতোমধ্যেই আমরা জানতে পেরেছি। স্বাধীনতার পর দেশি উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় অনেক সফল শিল্প প্রতিষ্ঠিত কিংবা বিকশিত হলেও, তথাকথিত ‘ই-কমার্স-শিল্পের উদ্যোক্তারা’ যাত্রার শুরুতেই এই মাত্রার গণ-প্রতারণার জন্য উদাহরণ হয়েই থাকবেন। মাসখানেক ধরে একটা অনলাইন পোর্টালে দুজন পলাতক ‘উদ্যোক্তা’, ইভ্যালির নিয়োজিত ‘সোস্যাল মিডিয়া সেলেব্রিটি’ এক ব্যারিস্টার, উপস্থাপক এবং কিছু কৈফিয়তদাতার ‘বয়ান’ শুনে এই সেক্টরের দুর্বৃত্তায়নের গভীরতা সম্বন্ধে একটা ধারণা পাওয়া গেল।

ইতিবাচক একটা কথা দিয়ে শুরু করি। দেশে একজন নামকরা জ্যেষ্ঠ ব্যবসায় পরামর্শদাতার (যিনি ষাট-সত্তর-আশির দশকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন) সাথে মাঝেমাঝে কথা হত। তিনি একবার বলেছিলেন, এক বিদেশি প্রতিষ্ঠান আশির দশকে বাংলাদেশে এসে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল, এই দেশে নিরাপত্তা রক্ষী-যোগানো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কেমন। তিনি বলেছিলেন, সাংস্কৃতিকভাবে চিন্তা করলে এর কোন ভবিষ্যৎ তিনি দেখেন না। বিপুল জনগোষ্টীর এই দেশের লোকজন ঐতিহ্যগতভাবেই ‘চৌকিদার’ ধারণাকে নিরাপত্তাপ্রদানের জন্য বেছে নিয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, তিনি কত বড় ভুল করেছিলেন। এই দেশের উদ্যোক্তারা এটাকে বিশাল শিল্প হিসাবে গড়ে তুলেছে। নদীমাতৃক এই দেশে মিনারেল ওয়াটার প্রথম দিকে মানুষজন ২০ টাকায় কিনেছে, যখন ডিজেলের লিটার ছিল ১৩ টাকা। কিন্তু সেবা কিংবা পণ্যের বিনিময়ে টাকা নিয়েছে।

এই লেখাটাতে আমি কিছুটা আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেছি। এই মাত্রার গণ-প্রতারণার পর মিডিয়াতে এসে আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে থেকে শুরু যারাই এই ব্যাপারে বলেছেন তাদের উদ্দেশে উদ্ধত আচরণ আমাকে অবাকই করেছে। এইসব তথাকথিত উদ্যোক্তারা এবং তাদের পক্ষাবলম্বীরা গণহারে কিছু অপমানকর কথা বলে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করে। এতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় - ‘ই-কমার্স ধারণাটা সবাই বুঝতে পারে না’, ‘ই-কমার্স আর এফ-কমার্সের পার্থক্য বোঝে না’, ‘এই বিজনেসের মডেল বুঝতে পারে না’, ইত্যাদি। মজার কথা হল, খন্দকার মিঠু নামের এক পলাতক উদ্যোক্তা (আনন্দের বাজার) এইসব বয়ান দিতে গিয়ে মডেলকে সবসময়ই ‘মডিউল’ হিসাবেই উল্লেখ করে চলেছেন (এই জ্ঞানী মডেল আর মডিউলের পার্থক্যই বোঝেন না)।

ই-কমার্স নতুন কিছু নয়, নব্বইয়ের দশকেই এর শুরু এবং সারা বিশ্বে সফলতার সাথে এই মডেলে ব্যবসা চলছে। পাশ্চাত্যে বহু বছরের পুরানো বড় চেইন-শপগুলিরও এখন ই-কমার্সের শাখা আছে এবং ভালোভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে। দেশে ই-ভ্যালি, ই-ওরেঞ্জ, আলিশা-মার্ট, আনন্দের বাজার, ধামাকা এবং এধরনের প্রতিষ্ঠানগুলি যা করেছে, সেটাকে পঞ্জি-স্কিমের একটা সরলীকৃত ভার্শন কিংবা লুজ ভ্যারিয়েশন বলা যায়। অসম্ভব স্বল্প মূল্যে পণ্য বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে ক্রেতা আকৃষ্ট করা, নতুন ক্রেতার টাকায় পুরানো ক্রেতাকে কিছু কিছু পণ্য সরবরাহ, ক্রেতার কাছ থেকে নেয়া টাকা বিজ্ঞাপনে এবং অন্যান্য খাতে ব্যয় – এটা কোনভাবেই কোন টেকসই ব্যবসায়ের মডেল হতে পারে না। (অর্থনীতির ভাষায় যাকে ‘ডাম্পিং’ বলে, সেটা কিন্তু এই বস্তু না)।

এই ব্যবসায়ের প্রচারণায় কয়েকটা কৌতূহলোদ্দীপক বৈশিষ্ট্যের দেখা পাই। প্রচারণায় (বিজ্ঞাপন এবং ব্র্যান্ড এম্বাসেডর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যশস্বী ব্যক্তিদের ব্যবহার করেছে, যেটা স্বাভাবিক। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদ, যেমন চিফ মার্কেটিং অফিসার ইত্যাদি পদেও পেশাদারদের পরিবর্তে তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগের সেলিব্রেটিদের ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। বিজ্ঞাপন তারকা বা ব্র্যান্ড এম্বাসেডররা এই প্রতারণায় আইনত দোষী না হলেও, নৈতিকভাবে দায়ী। (যুক্তরাজ্যের অভিনেতা পিয়ার্স ব্রসনানের ভারতের 'পান-পরাগ'-এর বিজ্ঞাপন বিতর্কের কথা বলা যেতে পারে)। কিন্তু চিফ অফিসারদের মত সিদ্ধান্তগ্রহীতা অফিসাররা আইনত দোষী বলেই গণ্য হবে।

আরেকটা কৌতূহলোদ্দীপক প্রচারণায় কথা বলা যায়। ‘ফেস-দ্য-পিপল’ নামের এক অনুষ্ঠানে ই-ভ্যালির আইনি মুখপাত্র ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার ‘অথরিটি’ (তিনি এই বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন) নিয়ে বললেন, ছয়-সাতটা বিদেশি ক্রেতা ই-ভ্যালিতে লগ্নি করার জন্য ‘লাইনে দাঁড়িয়ে আছে’। আমার নিজের অন্তত দু’টা সম্ভাব্য বিদেশি লগ্নির জন্য ‘ডিউ-ডিলিজেন্সের’ অভিজ্ঞতা আছে (আইনজীবীরা এবং একাউন্টেন্টরা আরও ভাল জানার কথা, অবশ্য যদি কিছুটা অভিজ্ঞতা থেকে থাকে)। সেটার আলোকে জনাব মজুমদারের কথা কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারি না। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, দেশে এমন উদ্যোক্তা আছেন, যাদের বিদেশে প্রচুর টাকা আছে, সুযোগ পেলে একটা শেল-কোম্পানি (Shell Company) তৈরি করে দেশে টাকা লগ্নি করতে পারে, কিন্তু তারাও এমন প্রতারণায় লগ্নি করবে না।

ব্যারিস্টার সাহেবের কথা বিশ্বাস না করার ছোট্ট একটা ব্যাখ্যা দেই। এধরনের বড় মাপের লগ্নি, প্রতিষ্ঠানের পুরোটা কিংবা অংশ বিশেষ কেনার জন্য প্রথমেই ইন্টারেস্টেড প্রতিষ্ঠানগুলি ‘ডিউ-ডিলিজেন্স’ বলে একটা প্রসেসের মধ্য দিয়ে যায়। ডিউ-ডিলিজেন্স হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, দেনা, এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনার একটা ব্যপক-ভিত্তিক মূল্যায়ন। একেবারে প্রাথমিক স্তরে প্রতিষ্ঠানের গত ৮/১০ বছরের ব্যবসায়িক হিসাব এবং আগামী ৮/১০ প্রজেকশনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়, এবং তার সাথে দেখা হয় সম্ভাব্য ‘লিগ্যাল এক্সপোজার’। পাঠক, শুধুমাত্র এই দুই নিরিখেই দাবীটার বিশ্বাসযোগ্যতা বুঝে নিন।

আরেকজন বললেন, বিএনপি প্যারিবাস (ফ্র্যান্স ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান) কত মিলিয়ন ডলার যেন লগ্নি করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। তার কথা যে কতটা সারবত্তাহীন, সেটা তার পরবর্তী কথায়ই প্রকাশ পায়। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি ই-কমার্সে লগ্নি করতে চায় না। দেশের বাণিজ্যিক বাংকগুলির লগ্নির ব্যাপারে ‘অন্যান্য’ ব্যাপার থাকলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সাথে অন্তত একটা ন্যূনতস ‘বিজনেস-প্ল্যান’ দরকার হয়। এই প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যাংকের জন্য কোন বিজনেস-প্ল্যান তৈরি করতে পারবে না।

তবে এই বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ এবং কিংবা বিদেশি ব্যাংকের লোন বিষয়ক প্রোপাগান্ডার একটা অস্বস্থিকর দিক আছে। প্রথমত এই বিষয়টা এতই অবাস্তব যে এটা প্রোপাগান্ডার সংজ্ঞার সাথে পুরোপুরি যায় না। প্রোপাগান্ডা সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে তৈরি করা হয়ে, কিন্তু এটা একটা অবাস্তব, নির্জলা মিথ্যা দাবি। অবশ্য এই টকশোর টার্গেট অডিয়্যান্স যারা তাদের চাঁদে মানুষ দেখে মাথায় পাগড়ি বেধে রাস্থায় ইতিহাস আছে। তাদের কাছে 'নির্জলা মিথ্যাই' সই। কিন্তু সহজে টাকা বানানোর এই দুর্বৃত্তের যে কোন দূরত্বে যেতে পারে। মধ্যেখানে যমুনা গ্রুপ এক-হাজারের একটা স্টান্ট দিয়ে আরও কিছু লোকজনকে পথে বসিয়েছে। যমুনা সম্ভবত এই মিথ্যা স্টান্ট দিয়ে নিজেদের পাওনা টাকা উদ্ধার করেছে। এখন এই বড় অংকের লুটপাটের টাকার খুব ছোট অংশ যদি কোন শেল-কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ হিসাবে দেখাতে পারে, তবে হয়ত কোন পাতিমন্ত্রী সাইকেল চালিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে চলে যাবে। আমার নিজের মার্জার এন্ড এক্যুইজিশন রেডিনেসের প্রশিক্ষণ আছে, ইন্টারেস্টেড কোম্পানিগুলি কাগজপত্র দেখার বহু আগেই সেকেন্ডারি সোর্স থেকে তথ্য নেয় (যেমন মিডিয়া)।

অবশ্য, মূলত ধর্ম/প্রতিক্রিয়াশীলতাকে পুঁজি করে চলা এই অনলাইনভিত্তিক চ্যানেলের দর্শকদের জন্য এই প্রচারণা ঠিকই আছে। ব্যারিস্টার সাহেব যখন দেশের বিচারব্যবস্থার কোন নির্দিষ্ট উদাহরণের কথা উল্লেখ না করে ঢালাও ভাবে মন্তব্য করেন, ‘এভাবে কি একটা দেশ চলতে পারে’, তখন মনে হয় আইনী লড়াইয়ের চাইতে প্রচারণাই মুখ্য উদ্দেশ্য।

আরও দু’টা ব্যাপার প্রচারণায় আনা হচ্ছে – গুড-উইল এবং কাস্টমার-বেইজ। বলা হচ্ছে গুড-উইল তৈরি করা হচ্ছিল বিদেশি ক্রেতা আকৃষ্ট করার জন্য, যাতে অনেকে গলা মিলিয়েছেন। এ-ব্যাপারে মন্তব্য করাই বৃথা – দশম শ্রেণির হিসাব-বিজ্ঞানের কোন ছাত্রের কাছে থেকে গুড-উইলের মূল ধারণা জেনে নিতে পারে এসব বিশেষজ্ঞ। অর্ধেকের চেয়ে কম মূল্যে পণ্য সরবারাহের যে কাস্টমার-বেইজ তৈরির দাবি করা হচ্ছে, বাজার মূল্যে পণ্য বিক্রি করলে তারা কেউই থাকবে না (কাস্টোমার লয়ালিটি অন্য ব্যাপার)। অবশ্য পলাতক উদ্যোক্তা নিজেই স্বীকার করেছেন, ক্রেতাদের একটা বড় অংশই রি-সেলার, সহজ ব্যবসায়ের সুযোগ দেখে আগুনে ঝাপ দিয়েছে।

বিদেশে যখন কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সংকট দেখা দেয়, তখন সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ বসানো হয়। বাংলাদেশেও ব্যাংকিং সেক্টরে এই ব্যবস্থা আছে, অন্য সেক্টরের আইনি ব্যাখ্যা জানিনা। যাইহোক, হাইকোর্ট ই-ভ্যালি পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটা অন্তর্বর্তী বোর্ড গঠন করে দিয়েছেন, বোর্ডের অন্য সদস্যদের মধ্য আছেন একজন সাবেক সচিব, একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং একজন আইনজীবী (ব্যারিস্টার)। এই বোর্ডকে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার, অন্য দুই পলাতক উদ্যোক্তা এবং উপস্থাপক এক অনুষ্ঠানে সাবেক বিচারপতি মানিকের ‘গীতব’ গাইলেন। সেই একই অভিযোগ – ই-কমার্স বুঝে না…ইত্যাদি ইত্যাদি। (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অবশ্য দেশ পরিচালনার জন্য সাবেক বিচারপতিকে প্রধান করা হয়েছিল)।

আমি অবশ্য এই গীবতে উদ্যেশ্য নিয়ে সন্ধিহান। হতে পারে মুর্খতা এবং ঔদ্ধত্যের বিষাক্ত সংমিশ্রণ কিংবা এই বিশৃঙ্খলা থেকে উদ্ধারের কোন আশা নাই যেনে ‘বোর্ডের’ উপর দোষ চাপানো।

ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের অ্যাসোসিয়্যাশন ই-ক্যাব নামক প্রতিষ্ঠানটিও এই প্রতারণার দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। ছয়-সাত মাস আগে ‘ডয়েচে ভেলের’ খালেদ মহিউদ্দিনের এক টক-শোতে বেসিসের (যদিও বেসিস নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই) আলমাস কবির বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এসক্রো-একাউন্ট’ প্রবর্তনের প্রতিবাদ করেছিলেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ই-ভ্যালির সম্ভাব্য প্রতারণার কথা জানার পরও ডিসেম্বরে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠান করে ইভ্যালিকে প্রতিমন্ত্রীর হাত দিয়ে পুরস্কারের প্রশ্নে ইক্যাব সভাপতি শমী কায়সার বলেন, কোভিড মহামারির সময়ে ইভ্যালির ‘মানবসেবার’ জন্য এই পুরস্কার। আমাদের আবেগ চড়া সুরে বাধা, নয়ত কি আর মহামারির সুযোগে বড় রকমের প্রতারণাকে পুরস্কৃত করা হয়। এখানে অস্ট্রেলিয়ার একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। এখানে কোলস এবং উলওয়ার্থস বলে দু’টা গ্রোসারি-চেইন আছে। কোভিড মহামারির সময় তারা স্বাভাবিক সময়ের বাইরে গভীর রাতে এবং ভোর-রাতে তাদের দোকান শুধুমাত্র স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য খোলা রেখেছিল। তারা কিন্তু কখনো মানবসেবার কথা বলেনি, এটা তাদের ব্যবসারই অংশ।

এইসব উদ্যোক্তারা এবং তাদের বড় সংখ্যক সমর্থকরা একটা কথা বলে চলেছেন, এসব প্রতিষ্ঠান একদিন অ্যামাজন-আলীবাবা হতে পারত কিন্তু কিছু রেগুলেটর এগুলির সর্বনাশ করছে। বিদেশে… ইত্যাদি ইত্যাদি। উদ্যোক্তাদের দাবি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও নাকি তাদের এই দাবির সাথে একমত। অ্যামাজন-আলীবাবা নিয়ে আলোচনা বাহুল্য মাত্র। দেখি ‘বিদেশে’ কী হয়।

আমি এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়াতে আছি। অস্ট্রেলিয়াতে চার ধরনের ব্যবসায়-কাঠামো আছে (সোল-ট্রেডার্স, পার্টনারশিপ, কোম্পানি এবং ট্রাস্ট) – ট্রাস্ট এখানে প্রযোজ্য নয় দেখে এ নিয়ে বিশ্লেষণ করলাম না। একক মালিকানাধীন (সোল ট্রেডার্স) এবং অংশীদারি (পার্টনারশিপ) ব্যবসার ক্ষেত্রে, প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা কিংবা প্রতারণার ক্ষেত্রে ব্যক্তি শাস্তি পান, এবং ব্যবসায়ের দায়ের জন্য ব্যক্তির নিজের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয় (প্রায় সব দেশেই একই নিয়ম)। কোম্পানির ক্ষেত্রে যেহেতু আলাদা আইনী সত্ত্বা তৈরি হয়, সাধারণত প্রতিষ্ঠানের দায়ের জন্য উদ্যোক্তা কিংবা ডাইরেক্টরদের নিজেদের সম্পত্তির উপর দায় জন্মায় না। কিন্তু এর ব্যতিক্রম আছে। অন্যতম প্রধান ব্যাতিক্রম হল, প্রতিষ্ঠানে দেউলিয়াত্বের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় পক্ষের সাথে ব্যবসা করা। দেউলিয়াত্বের লক্ষণ বোঝার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন – পরিশোধ করার মত ক্যাশ-ফ্লো আছে কিনা? এবং সম্পদ লিকুইডেট করলে সব দায় পরিশোধ সম্ভব কিনা? লক্ষণের বিস্তারিত বিবরণ (এখানে আর বর্ণনা করলাম না) সবগুলিই তথাকথিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে মিলে। আরেকটা কথা, দেশের অ্যামাজন-আলীবাবারা কিন্তু ব্যবসায়ের ন্যূনতম হিসাবও রাখে নাই। উদ্যোক্তাসমেত কেউই জানেনা মোট দায় আসলে কত।

অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি আইনে এই অপরাধের জন্য শাস্তি কী? ফৌজদারি অপরাধে ২ লক্ষ ডলার জরিমানা, ৫ বছরের কারাদণ্ড, আজীবন আর কোন কোম্পানি ডাইরেক্টর না হতে পারা এবং প্রতিষ্ঠানের দায় পরিশোধের জন্য ব্যক্তি হিসাবে নিজে দায়বদ্ধ হওয়া। তার উপর দেওয়ানি অপরাধে আরও ২ লক্ষ ডলার পর্যন্ত জরিমানা।

অনুসরণ করছি এর থেকে উত্তরণের জন্য সরকার কী কী ব্যবস্থা নেয়।


মন্তব্য

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

দুম্‌ করে লেখাটা শেষ করে দিলেন।

নানা রকমের পঞ্জি স্কিমের ব্যবসা দেখছি কম করে হলেও ত্রিশ বছর ধরে। অমন একটা ব্যবসা যখন শুরু হয় তখন প্রায় সবাই জানেন ওটা কী জিনিস। কিন্তু তার পরেও লোকে লোভে পড়ে তাদের ফাঁদে পা দেন। খুব অল্প কিছু মানুষ না বুঝে ফাঁসেন। সরকারী সংস্থাগুলো প্রথম থেকে দেখতে পায় কী চলছে, কিন্তু তারা গা করে না। এদেশে কোন ফৌজদারী অপরাধ হলে রাষ্ট্র বাদী হয়ে যায়। তখন পুলিশ স্বউদ্যোগে অ্যাকশন নিতে, মামলা করতে, তদন্ত করতে বাধ্য। অথচ মিডিয়া পুলিশকে জিজ্ঞেস করলে পুলিশ বলে, এই ব্যাপারে এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ জানায়নি; আমরা অভিযোগ পেলে আইননানুগ ব্যবস্থা নেবো।

ই-কমার্স বিষয়টা আইসিটি মন্ত্রণালয়ের জিনিস না। এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কিছু ক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশন ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর বিষয়। এটি যাদের বিষয় তাদের গেটওয়ে পার হয়ে ব্যবসাটা করতে হলে কিছু বাটপারি আপনা থেকে বন্ধ হয়ে যাবে। প্রণোদনার নামে আইনে শিথিলতা দেখালে শেষে রাষ্ট্র আর জনগণ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ই-কমার্স জিনিসটা মোটেও নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশে ই-কমার্সের নামে যা চলছে সেটা কতটুকু ই-কমার্স আর কতটুকু জুয়া সেটা খতিয়ে দেখা দরকার আছে। এটি না করলে সত্যিকারের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নৈষাদ এর ছবি

স্পট অন – দুম করে লেখা শেষ করে দেয়ার ব্যাপারটা। কিছুতেই বেশি সময় মন সংযোগ করতে পারিনা।

সেটা ঠিক – বহু রকমের রকমের পঞ্জি স্কিমের ব্যবসা হয়েছে, এবং চলছে। মনে আছে ডেসটিনি একজন সাবেক সেনাপ্রধানকে চাকুরি দিয়েছিল। পুলিশ এবং ফৌজদারী অপরাধ… এগুলো ঠিকঠাক করেই তো প্রতারকরা মাঠে নামে। তবে আইনি কাঠামো নিয়েও আমি সন্ধিহান। ই-ভ্যালির রাসেলকে ৪২০ ধারার প্রতারণার কী আইনি কাঠামোতে আটকাবে সে ব্যাপারে আমি সন্ধিহান।

তবে, এই ই-কমার্সের ক্ষেত্রে ‘অ্যা বাঞ্চ অভ জোকার্স’ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে একসাথে মহা সাড়ম্বরে প্রতারণা শুরু করেছে, পিছনে আছে চ্যালা-চামুন্ডার এক বিশাল বহর।

জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশন কিন্তু ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু অন্য সংস্থাগুলির সাথে সমন্বয়ের অভাবে হয়ত এগোতে পারেনি। এই প্রতারণার জাল যে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের কত বড় ক্ষতি করেছে… আপনার সেই মোবাইল বিক্রেতার কাল্পনিক কেসস্টাডির ফেসবুক স্টেটাসটা স্মরণীয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব এর ছবি

আইনী কাঠামো নিয়ে আপনার আশঙ্কা সঠিক। এখানে ফাঁকফোকড় অনেক। ধরুন এক লক্ষ লোকের সাথে প্রতারণা হয়েছে, যদি এক লক্ষ লোক এক লক্ষটা আলাদা আলাদা প্রতারণা মামলা করতেন তাহলে হয়তো তারা এক প্রকারের ন্যায়বিচার পেতে পারতেন। যদি এক লক্ষটি প্রতারণার ঘটনাকে একত্রিত করে এমন একটি মামলা চালানো যেতো যেখানে ঐ একটি মামলা এক লক্ষটি মামলার সমতুল গুরুত্ব পাবে তাহলেও হয়তো এক প্রকারের ন্যায়বিচার আশা করা যেতো। কিন্তু এসব কিছুই হয় না। কেন হয় না সেই প্রশ্ন তোলাটা অর্থহীন।

আমি মনে করি না গত দুই বছরে বর্গী হামলার মতো করে ই-কমার্সের নামে প্রতারকরা যে অপরিমেয় টাকা লুটে নিল সেগুলো বিচ্ছিন্ন সব ঘটনা। এগুলোর পেছনে অবশ্যই মাস্টারমাইন্ড কাজ করেছে - দেশের ভেতরের বা বাইরের। আমরা ১৯৯৭ সালে আলবেনিয়াতে পঞ্জি স্কিম কেলেঙ্কারীর কথা মনে করতে পারি। সেখানে একাদিক্রমে ২৫টি কোম্পানি ধরাশায়ী হয়েছিল, মোট ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ১.২ বিলিয়ন ডলার। সাড়ে একত্রিশ লাখ লোকের দেশের প্রায় ১২% মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। পরিণতিতে সেখানে গৃহযুদ্ধ বাঁধে যাতে কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারান।

আপনি একবার বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের প্রসার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের মূল্যে ব্যক্তিগত ঋণ দেয়া হয়েছে। কথাটি কী চরম সত্যি সেটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হাড়ে হাড়ে জানেন। এক একটি শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারীর সার্বিক ক্ষতি যে কতোটা ব্যাপক ও গভীর তা কল্পনাতীত। গত দুই বছরে ই-কমার্সের নামে কৃত প্রতারণার সার্বিক ক্ষতির ব্যাপকত্ব ও গভীরতাও অপরিমেয়। এইসব ক্ষতি কেবল আর্থিক বা ব্যবসায়ের ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

সত্যপীর এর ছবি

"ই-ভ্যালির আইনি মুখপাত্র ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার" - মজা পাইলাম এক। "ইক্যাব সভাপতি শমী কায়সার" - মজা পাইলাম দুই।

পুরো লেখায় সম্পূর্ণ সহমত, তবে ইকমার্স প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক এসক্রো করার ব্যাপারে একটু চিন্তিত। আমি বাংলাদেশের ইকমার্স সেক্টর নিয়ে কিছুই জানিনা, কিন্তু ধারণা করি কিছু ভালো সৎ প্রতিষ্ঠান আছে এবং ভবিষ্যতেও আসবে। এসক্রোর ফলে ক্যাশ ফ্লোতে মারাত্মক চাপ পড়ার কথা, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এই ধাক্কাতে টলে যেতে পারে। ঢালাও এসক্রোর বদলে টার্গেটেড এসক্রো (রেটিং, কমপ্লেন ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে) করে দেবার কথা ভাবা যেতে পারে।

..................................................................
#Banshibir.

নৈষাদ এর ছবি

শমী কায়সার (এবং ইক্যাবের অন্য কর্মকর্তা) কিন্তু প্রচুর ‘গলাবাজি’ করেছেন এবং সাফাই গেয়েছেন প্রথমে, যাইহোক এখন মনে হচ্ছে আন্তরিকভাবেই সরকারকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। ব্যারিস্টার সাহেবের ব্যাপার তেমন কিছু জানিনা, তাই মন্তব্য করলাম না। শুধু এটুকু বলতে পারি, দেশে অনেক করপোরেট ল’ইয়ারের সাথে কাজ করতে হয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে আমার ধারণা অনেক উচুতে, সেই তুলনায়… …বাদ দেন।

আমি নিজেও এসক্রোর পক্ষে না (আমি মূল লেখাতে যুক্ত করব), বিশেষকরে এমন প্রচুর পরিমানে ছোট ছোট লেনদেন এবং যেখানে প্রইয়োজনীয় প্রযুক্তির অভাব প্রকট।

লেখাটা দ্রুত লেখে ফেলেছি, আজ হয়ত কিছু কিছু তথ্য যুক্ত করব।

সবজান্তা এর ছবি

টেস্ট মন্তব্য।

নৈষাদ এর ছবি

টেস্ট পজিটিভ।

অবনীল এর ছবি

'ই-কমার্স মডেল বুঝে না' কথাটার সাথে কেন জানি 'আগে, অমুক ধর্মটি বুঝে আসুন, তারপর মন্তব্য করুন।' টাইপের মন্তব্যের সাথে মিল পেলাম। অনেক কিছু খোলসা হলো লেখাটা পড়ে। আরো তথ্যযুক্ত হলে আবার পড়বো।

___________________________________
অন্তর্জালিক ঠিকানা

নৈষাদ এর ছবি

ধন্যবাদ অবনীল। একেবারেই, এবং এমন সব লোকের ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছে, যারা এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। (যেমন ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম)

নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।